‘চার্লস ডিকেন্স’-এর বিখ্যাত নভেল ‘অলিভার টুইস্ট’।। হুসনুন নাহার নার্গিস
১৮ জুন ২০২৪, মঙ্গলবার
‘অলিভার টুইস্ট’- তদানিন্তন সময়ে ব্রিটেনের সামাজিক অবস্থার প্রতিচ্ছবি এবং দারিদ্র্যের দুরাবস্থা।

1901: A London slum family with all their possessions in the street following eviction (Photo by Hulton Archive/Getty Images)
‘চার্লস ডিকেন্স’ নামটি আমাদের কমবেশি সবারই জানা। তাঁর সেই বিখ্যাত নভেল ‘অলিভার টুইস্ট’ সিনেমাটি দেখেননি এরকম মানুষ খুব কমই আছেন। তিনি তাঁর বুদ্ধিমত্তা দিয়ে ফুটিয়ে তুলেছেন সেই সময়ের মানুষের জীবনচিত্র, দরিদ্রতার কষাঘাত, কঠোর জীবন, যা মন ছুঁয়ে যায়। জীবনের কষ্টগুলো ফুটিয়ে তুলতে কেন এমন পারদর্শী হয়েছিলেন এই লেখক? কারণ, তিনি নিজেও বেড়ে উঠেছিলেন দারিদ্র্যের চ্যালেঞ্জ উপেক্ষা করে।
ঘানার প্রখ্যাত লেখক ‘আফাবওয়া’ বলেছেন-
‘দারিদ্র্য হচ্ছে দাহ, আপনি এটাকে দেখেন না, জানতে হলে আপনাকে যেতে হবে এর মধ্যে দিয়ে।’
⬛ ভিক্টোরিয়ান যুগ:
১৮৩৭ থেমে ১৯০১ সাল পর্যন্ত সময়কে বলা হয় ‘ভিক্টোরিয়ান যুগ’। যদিও সময়টি ছিল শান্তিপূর্ণ এবং অর্থনৈতিক দিক দিয়ে দ্রুত উপরের দিকে উঠার, কিন্তু সমাজে ছিল শ্রেণিবৈষম্য। সমাজব্যবস্থা উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত এবং দরিদ্র এই তিন শ্রেণিতে বিভক্ত ছিল।
দরিদ্র শ্রেণি ধনীদের কলকারখানায় কাজ করত, ধনীরা লাভবান হত সস্তা মজুরির বিনিময়ে। যাকে সহজে বলা হয় শ্রম চুরি। ভিক্টোরিয়ান ক্লাস বেজড (বৈষম্যযুক্ত) সোসাইটি ব্রিটেন ছিল সেই সময়ে পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী একটি সাম্রাজ্য। দ্রুত শিল্পে উন্নত একটি রাষ্ট্র, যেখানে ধনী ছিল খুবই ধনী আর বাকি চারভাগের তিন ভাগ জনসংখ্যা ছিল ওয়ার্কিং ক্লাশ বা খেটে খাওয়া মানুষ। ইন্ডাস্ট্রি পরিচালনার জন্য এই দরিদ্র জনগোষ্ঠিকে কাজে লাগিয়ে ইন্ডাস্ট্রি প্রসার করতে সুবিধা হয়েছিল। দেশের ৮০ ভাগ দরিদ্র জনসংখ্যা ইন্ডাস্ট্রি ছাড়াও ধনীদের বাড়িতে চাকর হিসেবে কাজ করত। ধনী পুরুষ মানেই তাদের বিচরণ ছিল রাজনীতিতে, অনেক টাকার বেতন, প্রপার্টি বা ইন্ডাস্ট্রির মালিক। কিন্তু ভিক্টোরিয়ান আমলের প্রথম দিকে দরিদ্রতা ছিল প্রকট। বাড়ি-ঘরহীন, চিকিৎসার অপ্রতুলতা, অস্বাস্থ্যকর ও নোংরা পরিবেশ, সুপেয় পানির অভাব এবং শীতে গরম বস্ত্রহীন অবস্থায় দরিদ্র জনগোষ্ঠির দিন কাটাত।
⬛ শিশু মৃত্যুর হার:
১৮৪০ সালের দিকে প্রতি ছয়জন শিশুর মধ্যে একজন মারা যেত পাঁচ বছর হওয়ার আগেই। প্রতি ছয়জনের তিনজনই মারা যেত জন্ম জটিলতার কারণে জন্মগ্রহণের সময়।
⬛দেশান্তর (Migrant):
দারিদ্র্যের কারণে ভালো জীবনের আশায় দলে দলে মানুষ দেশান্তরিত হতো। দেশান্তরী হওয়ার পেছনে আরও একটি কারণ ছিল-ধনী ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রকট বৈষম্য। ১৮১৫ থেকে ১৯১৪ পর্যন্ত ১০ মিলিয়ন মানুষ ব্রিটেনে দারিদ্র্যের কষাঘাত থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য দেশান্তরিত হয় ।
⬛লেডি অফ দি লেজার :
উচ্চবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণির মহিলারা সব কাজ তাদের কাজের মানুষ বা চাকর দিয়ে করাতো এবং তারা বাইরে চাকরিও করত না। জীবন ছিল ‘লেডি অফ দি লেজার’! যার ফলশ্রুতিতে তারা স্থূলাকার (Obese) হয়ে পড়েছিল।
‘ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়’
দারিদ্র্যের কষাঘাত, অমানুষিক খাটুনি, অল্প মজুরির দরিদ্র শ্রেণি এই কঠিন জীবনকে ভুলে থাকার জন্য অপিয়াম নামক ড্রাগ সেবন এবং মদ্যপান করে মাতাল হয়ে পড়ে থাকত। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, ক্ষুধার জ্বালা এবং পর্যাপ্ত কাজ না থাকার জন্য অনেক মেয়েকে বেশ্যাবৃত্তি করতে হতো।
⬛ শিশুশ্রম :
চিত্র: শিশুশ্রম
দরিদ্র ভিক্টোরিয়ানরা অল্প বয়েসে উপার্জনের জন্য সন্তানদের কাজে প্রবেশ করিয়ে দিত। ১৮৪৮ সালে ৩০ হাজার গৃহহীন পরিবার রাস্তায় বা নোংরা খুপরিতে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে গাদাগাদিভাবে টয়লেট/গোছলখানা ছাড়াই বসবাস করত।
২৫ ভাগ জনসংখ্যা দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করত। এই অবস্থায় পড়ার জন্য দায়ি ছিল অধিক হারে সন্তান জন্মদান, প্রধান উপার্জনকারীর মৃত্যু বা অসুস্থ হওয়া, শারীরিক অক্ষমতা কিংবা কাজ না থাকা, বাবার পরিবার থেকে পলায়ন অথবা জেলে থাকা।
⬛ অলিভার টুইস্ট :
চিত্র: চার্লস ডিকেন্স (Charles Dickens)।
চার্লস ডিকেন্স তাঁর বুদ্ধিমত্তা দিয়ে এই দারিদ্র্যতার ভয়াবহ চিত্র ফুটিয়ে তোলেন বিখ্যাত নভেলে ‘অলিভার টুইস্ট’ এর মাধ্যমে। পরবর্তীতে ২০০৫ সালে
নির্মাতা রোনাল্ড হারউড উপন্যাসটিকে সিনেমায় রূপ দেন। একটি এতিম বালক যার জন্মের সময় তার মা রাস্তায় পড়ে থাকা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। পিতৃপরিচয়হীন অবস্থায় এতিম খানায়বড়ো হতে থাকে সে। দৃশগুলোতে দেখা যায়, এতিমখানায় বাচ্চাদের আধপেট খাবার দেয়া হচ্ছে। ক্ষুধার্থ থাকায় আর একটু খাবার চাওয়াতে কী নিষ্ঠুরভাবে তাদেরকে গালিগালাজ করা হচ্ছে। এক দৃশ্যে দেখানো হয়, একজন মহিলা স্বামীর হাতে বিনাকারণে মারধরের শিকার হচ্ছে। অথচ পালাবার স্থান না থাকায় সেই অবস্থাতেই তাকে দিন অতিবাহিত করতে হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে পথশিশুদের দিয়ে খাবারের বিনিময়ে চুরিবিদ্যা শেখানো হয় এবং তাদের দিয়ে চুরি করিয়ে গ্যাং লিডাররা ব্যবসা করছে।
জীবন যুদ্ধ, অমানবিক কষ্ট, শ্রেণিবৈষম্য, অবিচার, অত্যাচার এবং শিশুশ্রম এগুলোই এই উপন্যাসের প্রতিবাদ্য বিষয়। বিভিন্ন চরিত্রের মাধ্যমে সুচারুভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক।
চিত্র: অলিভার টুইস্ট সিনেমার পোস্টার।
একইভাবে তিনি দরিদ্র মানুষের জীবন, ম্যাটারনিটি হাসপাতালের প্রয়োজনীয়তা, অসহায় স্বামীর হাতে অত্যাচারিত মহিলাদের জন্য স্বতন্ত্র মহিলা হোস্টেল, শিশুশ্রম বন্ধ করার প্রয়োজনীয়তা এবং পথশিশুদের ঠিকমতো যত্ন না নিলে কীরকম ভয়ানক পরিণতি হতে পারে তা তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন চোখে আঙুল দিয়ে। বইটি প্রকাশ হয় ১৮৩৭ থেকে ১৮৩৯ সালের মধ্যে।
তখনকার লেখকেরা সাধারণত নিচুতলার মানুষদের নিয়ে বই লিখতেন না। তাদেরকে কৌশলে এড়িয়ে চলা হতো। উচ্চবিত্তের প্রেম-ভালোবাসা ছিল তাদের লেখার বিষয়বস্তু। চার্লস ডিকেন্স দরিদ্র জনগোষ্ঠীর দুরবস্থা তুলে ধরতে পেরেছেন। কারণ, তিনি নিজেও একজন ভুক্তভোগী ছিলেন। তার জন্ম ১৮১২ সালের ৭ই ফেব্রুয়ারি ল্যান্ডপোর্ট, পোর্টসমাউথ, যুক্তরাজ্যে। নয় বছর বয়সে তার স্কুল জীবন আরম্ভ হলেও ১২ বছর বয়সে স্কুল ছাড়তে হয় জীবিকা অর্জনের প্রয়োজনে। জুতো পালিশ করার ফ্যাক্টরিতে তিনি কাজ করেছেন সামান্য একজন লেবার হিসেবে। তাঁর বাবা জন’কে জেলে যেতে হয়েছিল দেনার দায়ে। যিনি ছিলেন একজন সামান্য বেতনের ক্লার্ক।
⬛ ওয়েলফেয়ার কান্ট্রির উৎপত্তি :
১৯০০ থেকে ১৯১০ সালে ওয়েলফেয়ার কান্ট্রির সূচনা হয় এবং ক্রমাগতভাবে ডেভেলপ হতে থাকে। ব্রিটিশ সরকার লিবারাল ওয়েলফেয়ার কান্ট্রির মধ্যে আসতে থাকে। Sir William Beveridge হলেন এর উদ্যোক্তা । দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর লেবার পার্টির হাতে ওয়েলফেয়ার কান্ট্রির গোড়াপত্তন হয়। তার উদ্দ্যেশ্য ছিল সমাজ থেকে দরিদ্র্যতা এবং হার্ডশিপ তথা কষ্টকর জীবন বিদায় করা।
⬛ ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের ক্ষমতা হ্রাস এবং কলনিওজমে বিদায় :
১৮৩২ সালে The reform Act দ্বারা পার্লামেন্টে ডেমোক্রাসির জন্ম। ১৯০০ সালে লেবার পার্টির জন্ম, যখন ট্রেড ইউনিয়ন এবং সোশ্যালিস্ট পার্টি বেশ ভালো মতো সংগঠিত হয়। রাজতন্ত্রের ক্ষমতা সংকোচিত হয়ে শুধুমাত্র symbolic এবং ceremonial এ পরিণত হয় । ভিক্টোরিয়ান আমলের শেষের দিকে House o Commons এর ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং House of Lords শক্তি হারাতে থাকে। যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে এক সময় সূর্য অস্ত যেত না তা শেষ হয়ে যেতে থাকে। এক এক করে সমস্ত কলোনি দেশগুলো স্বাধীনতা ঘোষণা করে। এই শতাব্দীর শেষ দিকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যর ক্ষমতা কমতে থাকে।
ভিক্টোরিয়ান আমলে পুরুষরা নারীকে মনে করত দুর্বল এবং ভোগের বস্তু। ক্রমাগতভাবে নারী সংঘ গঠিত হয়। নারী সংগঠন এবং শ্রমিক সংগঠন মাথা চাড়া দিতে থাকে।
⬛ সোশ্যাল সিকিউরিটি বা সামাজিক নিরাপত্তা :
সোশ্যাল সিকিউরিটি মানুষকে সামাজিক নিরাপত্তা দিল। যার আওতায় আসলো বেকার ভাতা, শারীরিক/মানসিক প্রতিবন্ধী ভাতা, ফ্রি চিকিৎসা , সিক লিভ , সবার জন্য পেনশন, বিধবা ভাতা, ফ্রি এডুকেশন, সিঙ্গেল মাদার ভাতা, গরিবদের জন্য বৃদ্ধ বয়সে বিনাপয়সায় দেখাশোনা, গৃহহীনদের আবাসন ব্যবস্থা।
চার্লস ডিকেন্সদের মতো লেখক তাদের লেখার মাধ্যমে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিলেন দরিদ্র জনসাধারণের কষ্ট। এভাবেই সমাজে তৈরী হয় সচেতনতা।
‘রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙ্গালের ধন চুরি’
কলোনি দেশগুলো থেকে দরিদ্র কৃষকদের দিয়ে কাঁচামাল উৎপাদন করিয়ে নিয়ে আসা, মেশিনারির উদ্ভাবন এবং স্থানীয় দরিদ্র জনগনকে লেবার হিসাবে ব্যবহার করে তখন ধনী আরও ধনী হয়েছিল।
তথ্যসূত্র :
Poverty in the Victorian era , Wikipedia
Victorian era History Society and Culture Britannica
ফটো ক্রেডিট :
Victorian era immigration
Malnourished and brutally beaten , Torian Britain Daily Mail On Line
Oliver Twist Drama
লেখক ও গবেষকঃ হুসনুন নাহার নার্গিস, নারী ও শিশু অধিকার কর্মী, লন্ডন।

















