Bunohash Banner

বিন্দুতে আমি।। নীলকণ্ঠ জয়

খ্রীস্টপূর্ব ২৯০ সনের কাছাকাছি সময়ে প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক মেট্রোড্রোরাস লিখেছিলেন, ‘এটা চিন্তা করা বোকামি যে, মহাবিশ্বে একমাত্র পৃথিবীতে জীবের বাস আছে। যেমন চিন্তা করা বোকামি যে, একটি শস্যক্ষেতে বীজ বপন করলে কেবলমাত্র একটি বীজ থেকেই চারা জন্মাবে।’

বাঙলা শিক্ষক দবির সাহেব মেট্রোডোরাসকে নিয়ে গবেষণা করতে শুরু করেছেন, যদিও তিনি বিজ্ঞানী কিংবা দার্শনিক কোনোটাই নন। তিনি এই বিষয়টি নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরে ভাবছেন। একসময় তার মনে হলো, এই মহাবিশ্বের খুব সামান্যই আমরা জানি। হয়তো বিন্দুমাত্র! তাহলে আমরা কেনো নিজেদের জ্ঞান-গরিমা নিয়ে এত বেশি অহংকারে মেতে উঠি? পৃথিবীজুড়ে অসংখ্য মানুষ এই মহাবিশ্বের তুলনায় নস্যিমাত্র। কল্পনাও করা যাবে না কতো ক্ষুদ্র! এই পৃথিবীর সব রহস্য উদঘাটন করার মতোন সক্ষমতাও আমাদের হয়নি! এখনো আমরা জানি না পৃথিবীর কেন্দ্রবিন্দুর রহস্য, অতল সমুদ্র এখনো অধরা!

‘বাবা?’ কন্যা শায়লার ডাকে সম্বিত ফিরে পেলেন দবির সাহেব।
‘বল মা, কিছু বলবি?’
‘হ্যাঁ, বাবা। আমার বান্ধবী শিলা গতকাল বললো, এই পৃথিবীর বাইরে নাকি আরোও প্রাণের সন্ধান চালাচ্ছে নাসা?’
‘হ্যাঁ মা, একদম ঠিক। তবে শুধু নাসা না, সারা পৃথিবীর সব বিজ্ঞানমহল এই ব্যাপারে সোচ্চার?’
‘কিন্তু পৃথিবীর বাইরে কি প্রাণ সম্ভব বাবা?’
‘কেন সম্ভব নয়?’ শায়লাকে প্রশ্ন করে নিজেই ভেঙে বলা শুরু করলেন, ‘বর্হিজাগতিক প্রাণের অস্তিত্বের কথা বর্তমানে কাল্পনিক মনে হলেও, বিজ্ঞানীদের একটি বিরাট অংশ বিশ্বাস করেন যে, এদের অস্তিত্ব রয়েছে। সাম্প্রতিককালে কিছু উল্কাপিণ্ডতে অতি প্রাথমিক ক্ষুদ্র জীবাণু কিংবা জীবাশ্মার ছাপের মত কিছু একটা দেখা গিয়েছে, কিন্তু পরীক্ষার প্রমাণ এখনও চূড়ান্ত নয়। এই কিছুদিন আগেও বর্হিজাগতিক সিগন্যাল পেয়েছে বিজ্ঞানীরা। সেগুলো নিয়ে বিস্তার গবেষণা চলছে। এই মহাবিশ্বের খুব অল্প পরিমাণ আমরা জানি, পড়ে আছে আরও অজানা অনেক কিছু। সুতরাং এটি ধারণা করার কোনো কারণ নেই যে, আমরাই এই মহাবিশ্বে একছত্র প্রাণের অধিকারী!’

শায়লা চোখ বড় বড় করে শুনছে। মনে মনে ভাবলো- বড় হলে এইসব বিষয়ে সে আরও পড়াশুনা করে জানতে পারবে। ‘এমন কোনো গ্রহ কি পাওয়া সম্ভব বাবা?’ শায়লা প্রশ্ন শুরু করলো।

‘হ্যাঁ, সম্ভব মা। এই মহাবিশ্বের যেটুকু আবিষ্কার করতে পেরেছি আমরা, তার মধ্যেই কয়েকশো গ্রহের দিকে নজর আছে বিজ্ঞানীদের। তাদের ধারণা পৃথিবীর বাইরে কিছু স্থান আছে যেখানে প্রাণ বিকাশ করতে পারে কিংবা আমাদের পৃথিবীর মতোন জীবন আছে সেখানে। সাম্প্রতিক সময়ে আবিষ্কৃত Earth-mass এর কাছে কাছাকাছি গ্রহে পানি থাকার সম্ভাবনাও রয়েছে।’

এটুকু শুনেও প্রশ্ন করে বসে শায়লা, ‘পৃথিবীর বাইরে প্রাণ থাকলে কী করে বোঝেন বিজ্ঞানীরা?’

‘খুব সুন্দর প্রশ্ন মামনি। এর জন্য বিজ্ঞানীরা নানা থিওরী এবং প্রযুক্তি ব্যবহার করেন। বড় হলে জানতে পারবে আরও। কেউ কেউ novel multi-stage memetic algorithm (MSMA)- এর মাধ্যমে এই ব্যতিক্রম খুঁজে বের করেন। এটি একটি অ্যালগোরিথম থিওরি, যা আসলে একটি স্ক্রিনিং টুল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই টুলের সাহায্যে যেসব গ্রহ নিয়ে গবেষণা চলবে তাদের মধ্যে বসবাসযোগ্যতার দৃষ্টিকোণ খুঁজে বের করেন গবেষকেরা।’

শায়লা আবারও প্রশ্ন করে বসে, ‘কিন্তু পৃথিবীর কতো বাইরে এভাবে স্ক্রিনিং করা সম্ভব?’

‘আমরা এই মহাবিশ্বের সামান্য অংশই আবিষ্কার করতে পেরেছি। সুতরাং এর মধ্যেই আপাতত সকল গবেষণা সীমাবদ্ধ। বিজ্ঞানীরা মিথেন গ্যাস, অক্সিজেন, ওজোন, হাইড্রোজেন কিংবা সমধর্মী গ্যাসে বা তরল কিংবা এদের মিশ্রণের উৎস সনাক্ত করার চেষ্টা করেন। যেমন, পাথরে এসকল গ্যাস থাকতে পারে, বরফের নদীতে, এমনকি আগ্নেয়গিরি থেকেও মিথেন গ্যাস বের হয়।পৃথিবীর বাইরে প্রাণের উৎস থাকার সবচাইতে আদর্শ যায়গা হলো ‘এক্সোপ্ল্যানেট’। বলতে থাকেন দবির সাহেব। শায়লা আবারও প্রশ্ন করে, ‘এক্সোপ্লানেট কী বাবা?’

দবির সাহেব উত্তর দিলেন, ‘Extrasolar planet কেই এক্সোপ্লানেট বলে। মানে হলো আমাদের সৌরজগতের বাইরের যেকোন গ্রহকে বোঝায়। বাংলায় এদেরকে বহিঃসৌরজাগতিক গ্রহ বলে।’

শায়লা এবার বুঝতে পারলো এক্সোপ্লানেট কী। এখন তার মনে প্রশ্ন জাগে- এক্সোপ্লানেটেই কেনো প্রাণের সন্ধান চলবে? মেয়ের মনের ভাব বুঝতে পেরে দবির সাহেব বলতে শুরু করলেন, ‘কারণ হলো এর পরিবেশ। ‘এক্সোপ্ল্যানেট’ নিজেদের নক্ষত্রপুঞ্জ থেকে খুব বেশি দুরে নয় অথবা খুব কাছেও নয়। তাই তাদের আবহাওয়াও খুব বেশি গরম নয় অথবা ঠাণ্ডাও নয়। যেমন আমাদের পৃথিবী। আর একারণেই এসব ‘এক্সোপ্ল্যানেটেই’ প্রাণের উৎস থাকার সম্ভাবনা বেশি বলে মনে করেন অনেক বিজ্ঞানীরা।’

নিঃশ্বাস ছেড়ে শায়লা বললো, ‘বুঝলাম বাবা। এই মহাবিশ্বের তুলনায় আমরা আসলেই কিছু নই।’

‘হ্যাঁরে মা, আমরা অতি ক্ষুদ্রতম অংশ জুড়ে এই মহাবিশ্বে অবস্থান করছি। এতোই সামান্য যে, তা অ্যামিবাতুল্য!’ দবির সাহেব মুচকি হেসে উত্তর দিলেন। শায়লা বললো, আমরা তাহলে একটি বিন্দুর মাঝে সামান্য কিছু বাবা! অথচ এই বিন্দুতে থেকেই আমাদের মাঝে কতো হিংসা, বিদ্বেষ, হানাহানি, উঁচুনিচু, জাত,পাত, ধর্ম বর্ণ নিয়ে বিভীষিকাময় পরিস্থিতি, মানুষের অহংকার, কতো কী!’

দবির সাহেব মেয়ের আত্মদর্শন দেখে আপ্লুত হয়ে উঠলেন। এমনইতো তিনি চেয়েছেন, তার কন্যা আদর্শ মানুষ হয়ে উঠুক। মনে মনে আশির্বাদ করলেন মেয়েকে। একটি তৃপ্তির হাসি হেসে বললেন, ‘সবাই যেনো এমন করে বুঝতে শেখে মা। তুই ভীতরে জ্বলে শিখেছিস, তোর অন্তর মরতে শিখেছে। যে ভিতরে ভিতরে মরতে জানে, সেইতো বাঁচতে শেখায় সবাইকে।’

(আমার গল্পগুলো থিওরিটিক্যাল হওয়ার উদ্দেশ্য হলো এইসব গল্পের মাধ্যমে কিছু তথ্য জানানো। গতানুগতিক গল্পের বাইরে গল্পগুলো নিশ্চয়ই ভালো লাগবে সবার।)