আলেকজান্ডারের “গঙ্গা রিডয়” তার মধ্যে “পুণ্ড্র নগর” ও থাকতে পারে
বঙ্গ
১৫ “বঙ্গ” আর “বাঙালি”শেকড়ের খোঁজে
আলেকজান্ডারের “গঙ্গা রিডয়” তার মধ্যে “পুণ্ড্র নগর” ও থাকতে পারে
আলেকজান্ডার একের পর এক রাজ্য জয় করে এসে দাঁড়াল ভারতের প্রান্তে।
পাঞ্জাবের রাজা “পুরু”কে পরাজিত করে ভারতে গভীরে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে সে।
দীর্ঘ ৮ বছর ঘরবাড়ি ছাড়া মানুষগুলো আর এগুতে চায়নি । হটাৎ থমকে গেল তাঁর বিশ্বজয়ী সৈন্য বাহিনী ।
কেন?
যে বীর আলেকজান্ডারকে কেউ থামাতে পারে
নাই, সেই বীর বাংলার মাটির গন্ধ পেয়ে কেন পিছিয়ে গেল?
আজ আমরা জানব ইতিহাসের সেই বিস্তৃত পরাশক্তি গঙ্গারিডির গল্প ।
ডিওডরাসগ্রীক ঐতিহাসিক “ডিওডরাস সিকুউলাস ,তাঁর “বিব্লিও থেকা হিস্ট্রিরিকা” গ্রন্থে লিখেছেন আলেকজান্ডার যখন গঙ্গা নদীর দিকে যাওয়ার পরিকল্পনা করছিলেন তখন তাঁর সেনাবাহিনী সেই দিকে আর যেতে চান নি।
তার কারণ পারস্যের সাথে যুদ্ধে তারা মাত্র কয়েকটি হাতি দেখেছিলেন ,তাতেই তাঁর সেনাবাহিনী দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন।
আর এখানে হাজার হাজার হাতির বিরাট এক বাহিনীর প্রাচীর তারাকে পেরুতে হবে।
“ঐতিহাসিক প্লুটার্কের” মতে এই হাতির সংখ্যা শুনে অনেক সৈনিক হতাশ হয়ে পড়েছিলেন ।
আলেকজান্ডারকে জানানো হল গঙ্গার ওপারে বিশাল এক রাজ্য আছে এবং তার এক শক্তিশালী রাজা আছে ।
যাদের আছে ২ লাখ পদাতিক সৈন্য ২০ হাজার অশ্বারোহী সৈন্য , ২ হাজার রথ, ৪০০০ প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত যুদ্ধ করার হাতি। এই হাতি বৃষ্টির মতো ছোড়া তীর সহ্য করতে পারে এবং আগুনের মধ্যে দিয়ে যেতে পারে।
সময়টা কখন:
সময়টা খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতক। এই গঙ্গা রিডয় রাজত্ব কাল বাংলার বুকে ৪০০ থেকে ৫০০ বছর বাংলার বুকে রাজত্ব করেছিল । কারণ আলেকজান্ডারের সময় থেকে তাদের দাপট শুরু হয়। মৌর্য আর গুপ্ত সাম্রাজ্যের মাঝখানের সময়টাতে তারা ছিল এক স্বাধীন এবং শক্তিশালী পরাশক্তি ।
গ্রীকদের পর রোমানরাও তাদের কথা সন্মানের সাথে লিখে গেছেন ।
গঙ্গা রিডয় কাল্পনিক কোনো গল্প নয়। আমাদের ইতিহাসে লেখা না থাকলেও গ্রীক আর রোমান ইতিহাসে ঠিকই লেখা আছে।
“মেগাস্থিনিস সেলুকাস নেকটারের দূত হিসেবে তিনি পাটলি পুত্রের এসেছিলেন । তিনি তার “ইণ্ডিকা” গ্রন্থে লিখেছেন গঙ্গার সবচেয়ে শক্তিশালী অংশটি শাসন করে এই গঙ্গারিডয়ের মানুষরা।
কুইনটাস কারটিয়াস রুকাস উল্লেখ করেন যে গঙ্গার ওপারে দুটি শক্তিশালী রাজা আছে ,প্রাসি আর গঙ্গারিডয়।
রোমান মহাকবি বার্জিল, তার কাব্যে এই বীর জাতির কথা লিখেছেন। বিখ্যাত ভূগোলবিদ টলেমী তার মানচিত্রে এই রাজ্যের অবস্থান দেখিয়েছেন।
বঙ্গের কোন স্থানে গঙ্গারিডয়-এর অবস্থান ?
গঙ্গার অববাহিকাঐতিহাসিক তথ্য এবং বিশ্লেষণ অনুযায়ী বর্তমান বাংলাদেশের এবং ভারতের পশ্চিম বঙ্গের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশ ছিল গঙ্গারিডয়ের মূল ভূখণ্ড ।
অর্থাৎ গঙ্গা এবং ব্রহ্মপুত্র যেখানে পড়েছে সেই বদ্বীপ অঞ্চলেই গঙ্গারিডয় গড়ে উঠেছিল এই শক্তি ।
টলেমী যাকে গঙ্গা নগরী বলছে প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে তা বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের চন্দ্র কেতুগড় অথবা নরসিংদী (বাংলাদেশ) ওয়ারী বোটেস্বর হতে পারে। ওয়ারী বটেস্বর ছিল একটি বন্দর নগরী এবং সেখানে পাওয়া জিনসগুলো ২৫০০ বছরের পুরানো। চন্দ্র কেতুগড় (পশ্চিমবঙ্গ) সামসময়িক সময়ের এবং এটাও ছিল নদীবন্দর
সে সময়ে “পুন্দ্রবর্ধন” ঐ অঞ্চলের অন্যতম জনপদ ছিল তাতে কোনো সন্দেহ নাই। হতে পারে পুণ্ড্রবর্ধন সেই গঙ্গারিডির অন্তর্ভুক্ত ।
গঙ্গারিডি বলতে প্রাচীন গ্রীক আর লাতিন ঐতিহাসিক গঙ্গাবিধৌত সমগ্র পুর্বাঞ্ছলকেই বুঝাতে চেয়েছেন ।
মহাবীর আলেকজান্ডার কর্তৃক ভারত আক্রমণ ভারতীয় ইতিহাসে যুগ নিদর্শক হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে।
কারণ তার সঙ্গী গ্রীক ঐতিহাসিকগণ ভারতবর্ষ সম্পর্কে যে বিবরণ লিপিবদ্ধ করে গেছেন তার ঐতিহাসিক মূল্য অপরিসীম ।
খ্রিস্টপুর্ব ৩২৬ অব্দে প্রাচীন গ্রীক ও লাতিন ঐতিহাসিকদের বিবরণ অনুযায়ী আলেকজান্ডার যখন বিপাশা নদীর তীরে পৌঁছেন তখন তারা আর এগুতে চায়নি ।
এই গঙ্গারিডির অবস্থান যা কিনা শত শত নদ-নদী দ্বারা বেষ্টিত, এক গোলক ধাঁধার এই অঞ্চল, আর উষ্ণ আদ্র জলবায়ু যা গ্রীকদের কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত এবং সৈন্য বাহিনীতে হাজার হাজার হাতির কথা শুনে তাদের সেনা বাহিনী আর এগুতে সাহস পাননি।
গ্রীকরা ম্যাসিডোনিয়ান ফ্যালাংস বা বর্শা নির্ভর যুদ্ধ পদ্ধতিতে অভ্যস্ত আর তা বিশাল হাতির দলের সামনে অকেজো হওয়ার সম্ভবনা ছিল । এই প্রতিকুলতা আর গঙ্গারিডার মরণপণ যুদ্ধ আলেকজান্ডারের সৈন্যদের ফিরে যাওয়ার প্রকৃত কারণ।
গঙ্গা রিডয়-এর লোকরা যে যুদ্ধ কৌশলেই দক্ষ ছিল তাই নয় তারা ধনীও ছিল।
কীভাবে তারা ধনী হয় ?
গঙ্গা নামক এক সমুদ্র বন্দর ছিল তাদের চালিকাশক্তি । এখান দিয়ে তাদের বিখ্যাত মসলিন, মুক্তা, গোলমরিচ যেত রোম আর মিশরে ।
এখন যেমন ডলারের দাপট তখন ছিল এই অঞ্চলের মসলা আর মসলিনের দাপট ছিল সারা বিশ্বে ।
রোমানরা বাংলার এই মসলিনের জন্য পাগল ছিল ।
এই সব বিক্রি করে তারা অঢেল অর্থ উপার্জন করতেন। আর সেই অর্থ দিয়ে সৈন্য বাহিনী পরিচালনা করতেন।
কোথায় হারিয়ে গেল এই গঙ্গারিডয় ইতিহাস
থেকে ? পেছনের কারণ কী?
এটিই ইতিহাসের এক বড় রহস্য ।
গবেষকরা মনে করেন এর পেছনে দুটো কারণ আছে ।
প্রথমত: ভৌগলিক পরিবর্তন। কারণ গঙ্গা তার গতিপথ ঘুরিয়ে ফেলেছিল । যার ফলে বড়ো বড়ো বন্যা, আর প্রাকৃতিক দুর্যোগ সমৃদ্ধ নগরগুলো ধ্বংস হয়ে যায়।
দ্বিতীয় কারণ রাজনৈতিক । মৌর্য আর গুপ্ত রাজাদের উত্থানে গঙ্গারিডয় বড়ো কোনো এক সাম্রাজ্যের সাথে মিশে যায় ।
তারা শেষ হয়ে যায়নি । তারা নুতুন কোনো পরিচয়ে এই বাংলার বুকেই মিশে আছে ।
গঙ্গারিডয় আজকে শুধু ইতিহাস বই-এর একটি নাম। কিন্তু তাদের রক্ত আর বীরত্ব আজও আমাদের ধমনীতে বইছে ।
আলেকজান্ডার যে বীরত্বের কাছে পিছিয়ে গিয়েছিলেন ,সেই বীরত্বের উত্তরাধিকারী আমরাই।
আমাদের শেকড় অনেক গভীরে, আমাদের ইতিহাস অনেক গর্বের ।
তাই আমাদের প্রত্যেকের জানা উচিত আমাদের প্রাচীন কালের ইতিহাস, যার উপরে ভিত্তি করেই আজকের আমরা।
হুসনুন নাহার নার্গিস
চলবে












