শুভজন্মদিন জোছনা ও জননীর কারিগর।। মেহের আফরোজ শাওন
মরিয়মদের বাড়িতে বাংলাদেশের পতাকা উড়ছে। মরিয়ম বিয়ের শাড়ি পরেছে। তার মন সামান্য খারাপ। কারণ শাড়িতে ঝোলের দাগ পড়েছে। রান্না করতে গিয়ে এই দাগ মরিয়ম নিজেই ফেলেছে। অনেক ধোয়াধুয়ি করেও এই দাগ উঠানো যাচ্ছে না।দাগটা এমন জায়গায় লেগেছে যে আড়াল করা যাচ্ছে না।
মরিয়ম বসে আছে তাদের বাসার সিড়ির সামনে। আজ সারাদিন সে কিছু খায়নি। যদিও ঘরে অনেক কিছু রান্না হয়েছে। এর মধ্যে অনেক তুচ্ছ রান্নাও আছে। একটা হলো খুবই চিকন করে কাটা আলুর ভাজি। আরেকটা কাঁচা টমেটো আগুনে পুড়িয়ে ভর্তা। এই দুইটা আইটেম নাইমুলের পছন্দ। মরিয়ম নিজে রেখেছে নতুন আলু দিয়ে মুরগির মাংসের ঝোল।
একটু পর পর মরিয়মকে খাওয়ার জন্য সাধাসাধি করা হচ্ছে। তার খুবই বিরক্তি লাগছে। সে তো অনশন করছে না যে সেধে তার অনশন ভাঙতে হবে। সে যথাসময়ে খেতে যাবে।
নাইমুল কথা দিয়েছিল দেশ যেদিন স্বাধীন হবে সেদিন সে উপস্থিত হবে। মরিয়ম জানে নাইমুল কথা রাখবে। যত রাতই হোক সে বাসার সামনে এসে গম্ভীর গলায় বলবে- মরি, আমি এসেছি। কেউ কথা না রাখলেও আমি নাইমুল। আমি কথা রাখি। এই বলে সে নিশ্চয়ই ইংরেজি কবিতাটাও বলবে- Anable Lee না কি সব হাবিজাবি।
সন্ধ্যার পর সাফিয়া এসে মেয়ের হাত ধরলেন। কোমল গলায় বললেন, মা তুই কতক্ষণ এখানে বসে থাকবি?
মরিয়ম বললো, মা, তুমি বিশ্বাস করো আমি ও না আসা পর্যন্ত বসেই থাকব।
রাত একটা বেজে গেল। মরিয়মের দুই বোন তাকে জড়িয়ে ধরে আছে। মরিয়মের মুখ ভাবলেশহীন। একসময় মরিয়ম বললো, তোমরা এখান থেকে যাও। আমি একা বসে থাকবো।
সবচে’ ছোট বোন করুন গলায় বলল, তুমি একা বসে থাকবে কেন? আমরাও বসি।
মরিয়ম কঠিন গলায় বলল, না। বোনরা উঠে গেল।
তারও অনেক পরে ঘন কুয়াশার ভেতর দিয়ে বাড়ির সামনে দাড়ি-গোঁফ ভর্তি এক যুবক এসে দাঁড়ালো। গম্ভীর গলায় বলল, সিঁড়িতে যে মেয়েটি বসে আছে, তাকে কি আমি চিনি? দীর্ঘকায় এই যুবক দুহাত ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মরিয়ম চিৎকার করে বলল, মা দেখো, কে এসেছে মাগো দেখো কে এসেছে! মাগো দেখো কে এসেছে!
মরিয়ম যুবকটিকে জড়িয়ে ধরে আছে। যুবকের বুকে মুখ ঘষতে ঘষতে বলছে- আহা, এইভাবে সবার সামনে আমাকে ধরে আছো কেন? আমাকে ছাড়ো তো। আমার লজ্জা লাগে।
নাইমুল কিন্তু তার স্ত্রীকে ধরে ছিল না। তার হাত এখনো প্রসারিত। কঠিন হাতে নাইমুলকে জড়িয়ে ধরেছিল মরিয়ম নিজেই।
পাঠক, মহান বিজয় দিবসে যে গল্প শেষ হবে সেই গল্প আনন্দময় হওয়া উচিত বলেই আমি এরকম একটা সমাপ্তি তৈরি করেছি।
বাস্তবের সমাপ্তি এরকম ছিল না। নাইমুল কথা রাখেনি। সে ফিরে আসতে পারেনি তার স্ত্রীর কাছে। বাংলার বিশাল প্রান্তরের কোথাও তার কবর হয়েছে। কেউ জানে না কোথায়। এই দেশের ঠিকানা বিহীন অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধার কবরের মধ্যে তারটাও আছে। তাতে কিছু যায় আসে না। বাংলার মাটি পরম আদরে তার বীর সন্তানকে ধারণ করেছে। জোছনার রাতে সে তার বীর সন্তানদের কবরে অপূর্ব নকশা তৈরি করে। গভীর বেদনায় বলে, আহারে! আহারে!
শুভ জন্মদিন- জোছনা ও জননীর কারিগর…












