জননী সাহসিকা কবি সুফিয়া কামালের ১১৩তম জন্মদিন।। বুনোহাঁস ফিচার
বেগম সুফিয়া কামাল (২০শে জুন ১৯১১ – ২০শে নভেম্বর ১৯৯৯) বাংলাদেশের একজন প্রথিতযশা কবি, সমাজ সংস্কারক, লেখিকা, নারীবাদী ও আধুনিক বাংলাদেশের নারী প্রগতি আন্দোলনের একজন পুরোধা ব্যক্তিত্ব।
স্বাধীন বাংলাদেশে নারী জাগরণের অগ্রদূত জননী সাহসিকা কবি বেগম সুফিয়া কামাল। বহুমাত্রিক প্রতিভাদীপ্ত উজ্জ্বল মহীয়সী এই নারী আজীবন মুক্তবুদ্ধির চর্চার পাশাপাশি সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের বিপক্ষে সংগ্রাম করেছেন। সাহিত্যচর্চার সঙ্গে সঙ্গে যে কোনো গণতান্ত্রিক আন্দোলনে-সংগ্রামে রেখেছেন সোচ্চার ভূমিকা। বাংলার প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে ছিল তাঁর আপসহীন দৃপ্ত পদচারণা।
গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পক্ষে এবং যাবতীয় অন্যায়, দুর্নীতি ও অমানবিকতার বিরুদ্ধে চিরকালই সোচ্চার ছিলেন তিনি । প্রগতিশীল সমাজ বিনির্মাণের এই স্বপ্নদ্রষ্টার ১১৩তম জন্মবার্ষিকী ও ১১৪তম জন্মদিন আজ মঙ্গলবার । ১৯১১ সালের ২০ জুন জন্মগ্রহণ করেন এই বরেণ্য কবি ও লেখক।
১৯১১ সালের ২০ জুন বরিশালের শায়েস্তাবাদের এক অভিজাত পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন সুফিয়া কামাল। তখন নারী শিক্ষা ছিল প্রায় দুঃস্বাধ্য কল্পনা। তাঁর বাবা সৈয়দ আবদুল বারী ছিলেন একজন আইনবিদ। মা সাবেরা বেগমের কাছে পড়তে শেখেন তিনি। মাত্র বারো বছর বয়সে সৈয়দ নেহাল হোসেনের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। সাহিত্যপাঠে ছিল স্বামীর অনুপ্রেরণা, যা তাঁকে পরবর্তীতে সাহিত্য রচনায় উদ্বুদ্ধ করে তোলে। ১৯২৩ সালে রচনা করেন প্রথম গল্প ‘সৈনিক বধূ’। এটি প্রকাশিত হয় বরিশালের তরুণ পত্রিকায়। ১৯২৬ সালে সওগাত পত্রিকায় প্রকাশিত হয় প্রথম কবিতা বাসন্তী । তিনি ছিলেন বেগম পত্রিকার প্রথম সম্পাদক। ১৯২৯ সালে তিনি বেগম রোকেয়ার ‘আঞ্জুমান-ই-খাওয়াতিন-ই-ইসলাম’ এ যোগ দেন। এ সময় বেগম রোকেয়ার আদর্শ তাকে আলোড়িত করে। ১৯৩১ সালে তিনি মুসলিম মহিলাদের মধ্যে প্রথম ইন্ডিয়ান মহিলা ফেডারেশনের সদস্য নির্বাচিত হন।
সুফিয়া কামাল ১৯৩২ থেকে ১৯৪১ সাল পর্যন্ত কলকাতা করপোরেশন প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকতা করেন। ত্রিশের দশকে কলকাতায় থাকার সময় রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, শরৎচন্দ্র ও বেগম রোকেয়ার মতো দিকপালদের সান্নিধ্য পান তিনি। ১৯৩৮ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘সাঁঝের মায়া’। এই কাব্যগ্রন্থে ভূমিকা লিখেছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। বাড়তি প্রাপ্তি হিসেবে যুক্ত হয়েছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরেরর প্রশংসা। তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থগুলো হচ্ছে- সাঁঝের মায়া, মায়া কাজল, মন ও জীবন, শান্তি ও প্রার্থনা, উদাত্ত পৃথিবী, দিওয়ান, মোর জাদুদের সমাধি পরে প্রভৃতি। গল্পগ্রন্থ ‘কেয়ার কাঁটা’। ভ্রমণকাহিনী ‘সোভিয়েত দিনগুলি’। স্মৃতিকথা ‘একাত্তরের ডায়েরি’। সুফিয়া কামাল ৫০টির বেশি পুরস্কার পেয়েছেন। এর মধ্যে বাংলা একাডেমি, সোভিয়েত লেনিন, একুশে পদক, বেগম রোকেয়া পদক, জাতীয় কবিতা পুরস্কার, স্বাধীনতা দিবস পদক উল্লেখযোগ্য।
প্রথম স্বামীর মৃত্যুর পর ১৯৩৯ সালে কামালউদ্দীন আহমেদের সঙ্গে সংসার শুরু করেন সুফিয়া কামাল। ১৯৪৭ সালে তিনি সপরিবারে ঢাকায় চলে আসেন। এর মাঝে বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষার দাবিতে শুরু হয় আন্দোলন। ১৯৫৬ সালে প্রতিষ্ঠা করেন শিশুদের সংগঠন ‘কচিকাঁচার মেলা’। ১৯৬১ সালে পাকিস্তান সরকারের রবীন্দ্রসংগীত নিষিদ্ধ করার বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা আন্দোলনের অগ্রভাগে ছিলেন তিনি। এ সময় একদল তরুণের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে গঠন করেন সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট; যার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতিও ছিলেন তিনি।
১৯৬৯ সালে মহিলা সংগ্রাম কমিটির সভাপতি সুফিয়া কামাল অংশ নেন গণঅভ্যুত্থানে। বর্জন করেন পাকিস্তান সরকারের দেওয়া ‘তমঘা-ই-ইমতিয়াজ’ খেতাব। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের দিয়ে গেছেন অকুতোভয় সহযোগিতা।
১৯৯৯ সালের ২০ নভেম্বর মৃত্যুবরণ করেন সুফিয়া কামাল। তাঁকে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়। বাংলাদেশে নারীদের মধ্যে তিনিই প্রথম এই সম্মান লাভ করেন।
🔆 কাব্যগ্রন্থ
সাঁঝের মায়া (১৯৩৮)
মায়া কাজল (১৯৫১)
মন ও জীবন (১৯৫৭)
প্রশস্তি ও প্রার্থনা (১৯৫৮)
উদাত্ত পৃথিবী (১৯৬৪)
দিওয়ান (১৯৬৬)
অভিযাত্রিক (১৯৬৯)
মৃত্তিকার ঘ্রাণ (১৯৭০)
মোর জাদুদের সমাধি পরে (১৯৭২)
Mother of Pearls and Other Poems (English poem)
🔆গল্প
কেয়ার কাঁটা (১৯৩৭)
মুক্তিযুদ্ধ মুক্তির জয় (মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিষয়ক গ্রন্থ)
🔆ভ্রমণকাহিনি
সোভিয়েতে দিনগুলি (১৯৬৮)
🔆স্মৃতিকথা
একাত্তরের ডায়েরি (১৯৮৯)
🔆আত্মজীবনী
একালে আমাদের কাল (১৯৮৮)
🔆শিশুতোষ
ইতল বিতল (১৯৬৫)
নওল কিশোরের দরবারে (১৯৮১)
🔆অনুবাদ
সাঁঝের মায়া – বলশেভনী সুমের্কী (রুশ) (১৯৮৪)।
তথ্যসূত্র:
উইকিপিডিয়া
দৈনিক জনকণ্ঠ।












