মেরের ডায়েরি: প্রাচীন মিশরের একুশ শতকের সবচেয়ে বড়ো আবিষ্কার।। হুসনুন নাহার নার্গিস
১৫ জুলাই, ২০২৪
একদল আর্কিওলজিস্ট খুঁজে বেড়াচ্ছিলেন কুফুর পিরামিডের পাথর কোথা থেকে এবং কীভাবে আনা হয়েছিল তা বের করার রহস্য। তাঁরা হলেন ফ্রান্স এর আরকেওলজিসস্ট ‘পিয়েরে ত্যালেল’ (Pierre Tallel) এবং তাঁর দল ।
কুফুর পিরামিডের এই বিশাল স্থাপনা, যার উচ্চতা ১৩৯ মিটার, বেস ২৩০.৩৩ মিটার, ভলিউম ২.৬ মিলিয়ন। যা বানাতে ২.৩ মিলিয়ন পাথরের দরকার পড়ে, যা একেকটা ২.৫ থেকে ১৫ টন ওজনের। ৪৫০০ বছরের আগে যখন কী না কোনো টেকনোলজি ছিল না, যা দ্বারা এই বিশাল ভারী পাথর সরানো যায়। তখন কেমন করে তারা এই বিরাট স্থাপনা বানালো, যা এখনো মানুষ বুঝে উঠতে পারে না ।
ঠিক সেই সময়ে পাওয়া গেলো বিখ্যাত সেই প্যাপাইরি। যাকে বলা হয় ‘ডায়েরি অব মেরের’।
‘মেরের ডাইরি’ এইজন্যই বলা হয় কারন ‘মেরের’ নামে একজন মিশরীয় সুপারভাইজার অর্থাৎ যার অধীনে একদল কর্মির কাজ পরিচালিত হতো, তার সেই নামটি লেখা ছিল সেই লগবুকে বা ডায়েরিতে। তাই ‘সুপারভাইজার মেরের’ নাম অনুযায়ী এই ডায়েরিটিকে বলা হয় ‘মেরের ডাইরি’। ‘মেরের’ ছিলেন সাড়ে চার হাজার বছর আগে পিরামিডের পাথর বহন এবং যোগান দেওয়ার সুপারভাইজার। তাছাড়া আর্কিওলজিস্ট পিয়েরে আরও পেলেন:
১) পাথর কাটার চিহ্ন
২) পাথরের গুহা থেকে পাথর সরানোর দুটো কাঠের লাইন, যার উপর দিয়ে পাথর গড়িয়ে আনা হতো। গড়ানোর সুবিধার জন্য রোলার।
৩) রেড সি -এর তীরে পুরনো জেটির ধ্বংসাবশেষ, যার বয়স পিরামিডের সমান
৪) শ্রমিকদের রাতে থাকার জন্য আস্তানা এবং
৫) সবচেয়ে বিরাট আবিষ্কার- পাথর এবং বালুর নিচে প্রায় ডাস্টের মতো ছেঁড়া প্যাপাইরি, যেখানে লেখা ছিল কুফুর পিরামিডের কাজ পরিচালনার রেকর্ড
৬) যখন সমুদ্রে ভাটা থাকে, সেখানে জেগে উঠা দুইশত মিটার জেটি
৭) ২৫ টি অ্যাংকর
৮ ) তুরায় পাথর কাটার কপারের ব্লেড
৯) নৌকার পালের পুরানো কাপড়
১০) একটি ৪০ মিটার লম্বা নৌকার অস্তিত্ব।
ছবি: সাড়ে চার হাজার বছরের পুরনো মেরের ডায়েরিটি এভাবেই ধুলাবালির মধ্যে পড়ে ছিল।
🚩ডায়েরি পাওয়ার স্থানঃ
কায়রো এবং হেল ওয়ানের মাঝামাঝি ওয়াডি আল -জারফ ( Wadi al-Jarf) নামক স্থানে, রেড সি’র কাছাকাছি তুরা (Tura Quarries) কোয়ারিতে বালু এবং পাথরের মাঝে এই প্যাপাইরিটি পাওয়া যায়। যার অনেক অংশ ছোটো ছোটো টুকরো হয়ে গিয়েছিল। সেখানে লেখা ছিল তুরা কোয়ারি থেকে গিজায় লাইম স্টোন বহন করার প্রাত্যহিক কর্মকাণ্ড বা লগবুক।
🚩ডায়েরি থেকে যা জানা যায়ঃ
১) উত্তর তুরা এবং দক্ষিণ তুরা থেকে কুফুর পিরামিডে লাইম স্টোন পরিবহন করার প্রতিমাসের পূঙ্খানুপুঙ্খ ডাটাবেইজ বা রেকর্ড
২) প্রতি ১০ দিনে দুই থেকে তিনটি করে ট্রিপ যাওয়া আসা করা
৩) একেকটি দুই থেকে তিন টন ওজনের ব্লক
৪) একেকটা বোটে ৩০টি করে ব্লক থাকতো
৫) প্রতিমাসে ২০০ শত ব্লক পরিবহন করা হতো
৬) মেরের আন্ডারে ৪০ জন বোটম্যান কাজ করতো
৭) সময়টি ছিল জুলাই থেকে নভেম্বর
৮) হেডিং এ থাকে মাসের নাম এবং সিজন
৯) হেলিওপলিস-মিশরের একটি স্থান এবং সেখান থেকে শ্রমিকদের খাবার সরবরাহের রেকর্ড
১০) উত্তর তুরা থেকে মেরের তার শ্রমিক দলের সাথে পাথর টানায় ব্যাস্ত থাকা
১১) তারা সকলে রাত কাটাতো দক্ষিণ তুরায়
১২) অনেক টিমের সমন্বয়ে কাজ চলতো এবং একেক টিমে ৬০ জন লেবার থাকতো ।
এসব থেকে বোঝা যায় এই বিশাল কর্মযজ্ঞ ঠিকঠাক মতো করার জন্য যে অর্গানাইজেশন এবং ম্যানেজমেন্ট স্কিল থাকা দরকার তা তাদের ছিল। পরিবহনের সুবিধার জন্য তারা পানি এবং বাতাসের ব্যবহার জানতো । শ্রমিকেদের দেখভাল সুচারুরূপে সমাপন হতো ।
এর আগে ১৯৯০ সালে কায়রোতে পাওয়া গেল পিরামিডের কাছে ওয়ার্ক ম্যান ভিলেজে ৯ ফুট গভীর এক কবর থেকে এক ডজন পিরামিড শ্রমিকের কঙ্কাল। তাদের দেয়ালচিত্র থেকে জানা যায় তারা স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে নিজ ইচ্ছায় কাজে যোগ দিয়েছিলেন দেবতাকে সন্তুষ্ট করার জন্য। পিরামিড স্লেভ দ্বারা করা হয় নাই। ১০ হাজার লেবারের জন্য গরু এবং ভেড়া সরবরাহ হতো খাবার যোগানোর জন্য । জাহি হাওয়াস বলেন তারা ফ্রি ছিল এবং জোর পূর্বক কাজ করানো হতো না।
🚩ডায়েরিতে পাওয়া নামঃ
কুফুর সৎভাই আংখ্যাফ (Ankhhaf) এর নাম, যিনি কিনা একজন প্রিন্স এবং ভাইজার হিসাবে কুফু এবং কাফ্রার আন্ডারে কাজ করতেন। ওয়াডিআল-জারফ -এর ফ্যারনিক হারবারটি খুঁজে পাওয়া যায় ২০১১ সালে । খনন কার্য্য চালনা এবং আন্যালাইসিস করা হয় ২০১১ সাল থেকে । ২০১৩ সালে পাওয়া প্যাপাইরিটি লেখা হয়েছিলো 2600BC তে, যা কী না পৃথিবীর সবচেয়ে পুরাতন লগবুক । যেখানে রেকর্ড করা আছে শ্রমিক দলের সুপারভাইজারের নাম, যিনি ‘মেরের’ এবং পণ্য পরিবহনের নিবন্ধন ।
🚩লেখাগুলো যারা উদ্ধার করলেনঃ
প্যারিসের শরবনে ইউনিভারসিটির একটি ফ্রেঞ্চ মিশন এবং গ্রেগরি মারোউরাড (Gregory Marouard)এর তত্ত্বাবধান ও নির্দেশনায় সময়টা ২০১৩ সাল। মিশরের মিউজিয়ামে ঐতিহাসিক দলিল দস্তাবেজের রেকর্ড রুমে টুরিস্টদের দেখানোর জন্য বিশেষজ্ঞের নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। প্রত্যেকটি ছেঁড়া এবং ছোটো ছোটো টুকরোকে একত্র করে তা পুনরায় পড়ার মতো করা হয়েছিল । যা দেখানো হয় মিশরের নতুন ‘গ্র্যান্ড ইজিপসিয়ান মিউজিয়ামে’।
আর্কিওলজিস্ট এবং ইজিপ্টলজিস্ট যাহী হাওয়াস বলেন, ‘মেরের লগবুক’ একুশ শতকের সবচেয়ে বড় আবিষ্কার। প্রাচীন মিশর নিয়ে আগ্রহী যে কোনো মানুষের জন্য এটা একটা বিরাট খবর।
(বাদল বরিষণে/বুনোহাঁস সপ্তম সংখ্যা)














