শিল্প বিপ্লবের আদ্যোপান্ত: হুসনুন নাহার নার্গিস
১৭৬০ সাল থেকে ১৮৪০ পর্যন্ত সময়কাল কৃষি এবং বাণিজ্যিক ব্যবস্থা থেকে আধুনিক শিল্পায়নের দিকে গতি শুরু হওয়ায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যে বিরাট পরিবর্তন হয় তাকেই শিল্পবিপ্লব বলে। কার্লমার্ক্স ‘শিল্পবিপ্লব’ শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন।
ছবি: jemes Lancaster, 1601সালে যিনি প্রথম ইস্ট ইন্ডিয়ান কোম্পানির হয়ে পাক ভারতে আসেন
পঞ্চদশ এবং ষোড়শ শতাব্দীর সমুদ্র যাত্রা সারা বিশ্বে ব্যাবসা বাণিজ্যের রাস্তা খুলে দেয়। বাণিজ্যের রাস্তা খুলতে এটা একটা টার্নিং পয়েন্ট ।
ব্রিটেনে সর্ব প্রথম শিল্প বিপ্লব হয়। ১৭৬০-১৮৩০ সাল পর্যন্ত এই শিল্প বিপ্লব শুধু মাত্র ব্রিটেনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।
ছবি: শিল্প বিপ্লবের আগে যে ভাবে ব্রিটেনে কুটির শিল্পের মতো তাঁতের কাজ চলতো
শিল্প বিপ্লব হওয়ার আগে ব্রিটেনের অর্থনীতি ছিল কৃষিভিত্তিক । এর আগে সবকিছু হাতে তৈরি হতো। পেশীশক্তির দ্বারা সবকিছু চালনা করা হতো । ঘোড়া দ্বারা জমি চাষ, কাপড় বোনা, সুতা কাটা বা মাটি কাটার কাজ সবকিছুই মেশিন ছাড়া হাত দিয়ে করা হতো ।
১৭০০ সালের প্রথম দিকে ব্রিটেনে ঘরে ঘরে কুটির শিল্পের মতো তাঁত শিল্প ছিল। পরিবারের সবায় মিলে এই কাজ গুলো ভাগাভাগি করে করতো। কেউ সুতা কাটতো কেউ তুলা বা উল সফট করতো কেউ রং দিতো আর কেউ বা তা তাঁতে বুনত।
ছবি:প্রথম স্টিম ইঞ্জিন
⬛ স্টিম ইঞ্জিনের ব্যবহার:
স্টিম ইঞ্জিন আবিষ্কারের পর এই টেক্সটাইলের কাজ মেশিনের সাহায্যে শুরু হলো। ১৮০০ সালের দিকে ২০০০ বাষ্প চালিত ইঞ্জিনের দ্বারা নানা জিনিস বানানো আরম্ভ হয়।
১৭৭০ সালে Notinghame এবং Cromford এ Richard Arkwright নামক এক বিরাট সুতোর ফ্যাক্টরি খোলেন। সেখানে ৬০০ লোকের নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।
জেমস ওয়াট এবং ম্যাথুউ ব্যালটন আর এক কারখানা স্থাপন করে এবং সেখানে ১০০০ লোক নিয়োগ দেয়া হয়। সেখানে বোতাম, বাকল, বক্স এসব বানানো হতো। বেশিরভাগ কারখানা অস্বাস্থ্যকর ছিল এবং নারী, শিশু, এতিম খানার ছেলে মেয়ে এবং জেলখানার বন্দীদেরকে খাটানো হতো দৈনিক ১২/১৩ ঘণ্টা করে এবং অল্প মজুরীতে । সেখানে দুর্ঘটনা লেগেই থাকতো।
জেমস হারগ্রেভস ( James Hargreaves) ১৭৬৪ সালে Spinning Jenny আবিষ্কার করেন । যা দ্বারা ৮ গুন বেশি কাপড় উৎপাদন হতো। রিচার্ড আর্করাইট ১৭৬৭ সালে স্পিনিং মেশিন আবিষ্কার করেন। যা দ্রুততার সাথে সুতা উৎপাদন এবং স্পিনিং করতে পারত। যার ফলে Mass Production আরম্ভ হয়। ১৮৫৮ সালে ৯৬৮ মিলিওন গজ থেকে ১৮৭০ সালে তা বিলিয়ন গজে পওছায় ।
ছবি: জেমস ওয়াটের স্টিম যে ভাবে শক্তিতে পরিণত হতো
⬛স্টিম ইঞ্জিন যেভাবে কাজ করে:
জেমস ওয়াট স্কটল্যান্ডের এক বিজ্ঞানী যিনি অমর হয়ে আছেন তার বিখ্যাত আবিষ্কার স্টিম ইঞ্জিন আবিষ্কারের মাধ্যমে ।
কয়লার সাহায্যে পানি গরম করে বাষ্পে পরিণত করা। তা রাখা হয় একটা আবদ্ধ স্থানে সুদৃঢ় ভাবে ।যাকে বলা হয় বয়লার । একটা পিস্টনের সাহায্যে সেই পুরো বাষ্প চাপ দিয়ে একটা সরু নলের মধ্যে প্রেরণ করা হয় এবং ক্রমাগত ভাবে উঠানামা করে পিস্টন টি। এবং সেই বাষ্পের ফর্স দ্বারা চাকা চালনা করে কাজে গতি আনাই হল ষ্টীম ইঞ্জিনের কাজ।
এই ইঞ্জিন আবিষ্কার করে সর্ব প্রথম ব্রিটেন। যার ফলে ১৮ শতাব্দীর মধ্যভাগে ব্রিটেন হয়ে উঠেছিল পৃথিবীর কমার্শিয়াল ব্যাবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্রস্থল । আর এভাবেই শিল্প বিপ্লবের আরম্ভ হয়।
এই মেশিন আবিষ্কারের ফলে অল্প সময়ে অনেক বেশি জিনিসপত্র তৈরি হয়। যা প্রথমে টেক্সটাইল মেশিনেই ব্যবহার করা হয়।
⬛ শিল্প বিপ্লবের পেছনের কারণগুলো:
১) কয়লা ২) লোহার ব্যবহার ৩) মূলধন ৪) মেশিনের আবিষ্কার ৫) বাষ্পীয় শক্তি ৬) টেক্সটাইল ৭) উপনিবেশ ৮) সস্তা শ্রমিক ৯) ভালো যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং ১০) পানির জোগান।
সুতা কাটা মেশিন, উল বা সুতা বোনা তাঁত, স্ক্রিউ কাটার মেশিন বা লেদ মেশিন, সিলিন্ডার বোরিং মেশিন এবং মিলিং মেশিন এগুলো চালিত হতো বাষ্পীয় ইঞ্জিনের মাধ্যমে। ১৭৫০ সালের মাঝামাঝি থেকে ব্রিটেনে নানা রকম টেকনোলজির আবিষ্কার ও স্টিম ইঞ্জিনের ব্যবহারের আরম্ভ হয় এবং তা ক্রমাগত উন্নত হতে থাকে।
ব্যাবসা-বাণিজ্যের বৃদ্ধি এবং তার উন্নতি করতে শিল্প বিপ্লবের উত্থান হয়। ইতিহাসে শিল্প বিপ্লব একটা টার্ননিং পয়েন্ট ।
⬛ যেভাবে শিল্পবিপ্লব ব্রিটেন থেকে বেরিয়ে অন্য দেশে ছড়িয়ে পড়লোঃ
এই বিপ্লব শুধুমাত্র ব্রিটেনেই সীমাবদ্ধ ছিল। তারা চাননি তাদের আবিস্কৃত মেসিনারিজ, উৎপাদনের টেকনিক এবং ইঞ্জিন কোথাও যেন রপ্তানি না হয়। উদ্দেশ্য ছিল তারাই এর একচেটিয়া ফল ভোগ করতে চেয়েছিল। তবে ব্রিটেন তাদের এই একচেটিয়া মনোপলি ধরে রাখতে পারিনি। যেসব কারণে এই মেশিনের ব্যাপারটি ছড়িয়ে পড়ে, অন্যদেশের মানুষ এসে মেশিনগুলো কীভাবে চলে তা দেখে যায় আর টেকনিকগুলো শিখে নিয়ে নিজ দেশে তা নিয়ে যায়। প্রতিবেশী দেশগুলো এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়ার পথে মেশিনগুলো চুরি করে নিতো কীভাবে চলে তা দেখার জন্য। এভাবেই অন্য দেশের মানুষ বুঝে ফেলে ইঞ্জিনের আদ্যপান্ত।
কিন্তু যখন থেকে কিছু ব্রিটিশ ব্যাবসায়ী দেখলো যদি তারা অন্যদেশে ইন্ডাস্ট্রি স্থাপন করে তাদের লাভ বেশি হবে। তখন তারা তাদের কিছু স্কিলড লেবারকে সুযোগ সুবিধা বেশি দিয়ে, তাদের সাহায্যে বিদেশে ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তুলে। William এবং John Cockerill নামক দুইজন ব্রিটিশ সর্বপ্রথম বেলজিয়ামে শিল্পবিপ্লব নিয়ে আসে। ব্রিটেনের মতোই বেলজিয়ামে লোহা এবং কয়লা ছিল । ১৮০৭ সালে বেলজিয়াম হল ব্রিটেনের পর ইয়োরোপের প্রথম দেশ যেখানে শিল্প বিপ্লব আরম্ভ হয় এবং অর্থনৈতিক পরিবর্তন হতে থাকে।
বেলজিয়ামের পর ফ্রান্সেও আস্তে আস্তে শিল্পবিপ্লব এগুতে থাকে কিন্তু তা ছিল খুব ধীরগতি। কারণ সেখানকার পলিটিক্যাল অবস্থান বড় ইন্ডাস্ট্রি বসানোর পক্ষপাতি ছিল না। তবে, ১৮৪৮ সালে ফ্রান্স শিল্পবিপ্লবের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।
১৮৭০ সালে জার্মানিতে শিল্পবিপ্লব আরম্ভ হয়। যদিও জার্মানিতে কয়লা এবং লোহার ডিপোজিট ছিল কিন্তু তাদের জাতিগত ঐক্য না থাকার কারণে তারা পেছনে পড়ে যায় । যখন আরম্ভ হল তখন খুব দ্রুতগতিতে এগুতে থাকে। সেই শতাব্দীর শেষের দিকে স্টিল উৎপাদনে ব্রিটেনকেও পিছনে ফেলে দেয় এবং ক্যামিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিতে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী উৎপাদকে পরিণত হয়।
এরপরে ১৯ এবং ২০ শতকে U.S. এবং জাপান শিল্পবিপ্লবে যোগ দেয়। USA থেকে ফ্রান্সিস ক্যাবট লন্ডনে এসে স্পিনিং এবং অয়েভিং মেশিন নিজ দেশে নিয়ে যায় ১৮১০ সালে । ১৯০০ সালের দিকে USA ব্রিটেনকে পেছনে ফেলে উৎপাদনের ক্ষেত্রে।
২০শতকের প্রথম দিক পর্যন্ত পুর্ব ইউরোপের দেশগুলো পেছনে পড়েছিল। রাশিয়া ব্রিটেন থেকে ১৫০ বছর পেছনে ছিল এই শিল্প ঘটানোর ব্যাপার টিতে।
⬛ যোগাযোগ ব্যাবস্থাঃ
শিল্প উন্নয়নের জন্য ভালো ট্রান্সপোর্ট একান্ত জরুরী। কিন্তু ব্রিটেনের বেশির ভাগ রাস্তা ছিল ভাঙ্গা আর শীতকালে বৃষ্টির সময় থাকতো পানির নিচে এবং রাস্তায় ডাকাতির ভয় থাকতো। এক স্থান থেকে আর এক স্থানে যেতে অনেক সময় লাগতো । তারপর ‘Turnpike Act’ পাশ হয় রাস্তা বন্দর তৈরী করার জন্য। রাস্তা তৈরীর খরচ তোলা হতো টোলের মাধ্যমে। দুইজন বিখ্যাত ইঞ্জিনিয়ার John Me Adam এবং Thomas Telford তাদের নতুন টেকনোলজি দ্বারা রাস্তার উন্নতি হয়। ১৭৮০ সালকে ‘The Great Road Boom’ বলা হয়। ১৮৩০ সালে লন্ডন থেকে এডিনবরা যেতে দুই দিন লাগতো যা ৫০ বছর আগে দুই সপ্তাহ লাগতো।
পানিপথে চলাচলের জন্য ক্যানেলের উন্নয়ন করা হয়।
⬛রেলপথঃ
১৮২৫ সালে প্রথম স্টিম ইঞ্জিনচালিত Locomotive চালু হয়। রেল রোড তৈরি করেন George St ephenson, লিভারপুল থেকে ম্যানচেস্টার ট্রেন চলে ১৮৩০ সালে।
স্টিম ইঞ্জিন দ্বারা রেল চলাচল শুরু হয় বেলজিয়ামে ১৮৩৪ সালে, ফ্রান্সে ১৮৪২ সালে, সুইজারল্যান্ডে ১৮৪৭, জার্মানিতে ১৮৫০ সালে রেল চলাচল আরম্ভ হয়। রেলের উন্নয়ন মানে দ্রুত এবং সস্তায় চলাচল।
ছবি: ব্রিটিশ কিংডম
⬛ উপনিবেশ এবং শিল্পবিপ্লবঃ
শিল্পবিপ্লবের জন্য ব্রিটেনের উপনিবেশ একটা বিরাট ভূমিকা রেখেছিলো। আফ্রিকা, এশিয়ার অনেক দেশ এবং নর্থ আমেরিকা ছিল ব্রিটেনের উপনিবেশ ।
প্রথমে ব্রিটিশরা পাক ভারত উপমহাদেশে বাণিজ্য করার জন্য ১৬০৮ সালের আগস্টের ২৪ তারিখে ‘সুরাট ‘ এ আসে। তখন ছিল মুঘল আমল এবং সম্রাট জাহাঙ্গীরের কাছে সুরাটে কারখানা করার জন্য অনুমতির আবেদন করে ১৬১৩ সালে Captain William Hawkins। অন্যান্য ইওরপিয়ান দেশও ব্যাবসা করতে চেয়ে ছিল কিন্তু ব্রিটিশরা শক্তিশালী থাকাতে তারা আসতে পারিনি।
ভারতীয় সভ্যতা ব্রিটেনের চেয়ে পুরানো ছিল । ৪০০০ হাজার বছর আগে হরপ্পা মহেঞ্জোদারো সভ্যতা গড়ে উঠেছিল এবং ব্রিটেনের কোন লিখিত ভাষা ছিলনা ৯ম শতাব্দী পর্যন্ত।
ঠিক সে সময়ে ব্রিটেনের ছিল শক্তিশালী অর্থনীতি ভারতের চেয়ে, ছিল উন্নত অস্ত্রশস্ত্র এবং ‘ইউরোপিয়ান সাহস’ । যা ব্যাবহার করে আস্তে আস্তে পুরো ভারত উপমহাদেশে তারা নিজেদের আয়ত্তে নিয়ে নায়।
ভারত থেকে মসলা তারপর সিল্ক, কটন, পাট, রং, মসলিন এবং অপিয়াম নিয়ে যেতো। আমাদের বেঙ্গল ছিল কটন, সিল্ক, মসলিন এবং পাট রফতানির প্রধান কেন্দ্র।
James Lancaster ১৬০১ সালে প্রথম East India Company পরিচালনায় আসে। পুরো ভারতবর্ষে তারা কার্য কলাপ চালায় এই কোম্পানি দ্বারা। কলকাতা, মাদ্রাজ এবং বোম্বে ছিল তাদের প্রধান বাণিজ্য কেন্দ্র।
⬛ ব্রিটেনের শিল্পবিপ্লব এবং পাকভারত উপমহাদেশে তার প্রভাবঃ
ছবি: পাক ভারত উপ মহাদেশে যে ভাবে তাঁতিরা কাজ করতো
পাক ভারতে আমাদের আগে থেকেই হাতে চালিত তাঁত শিল্প ছিল । যা দ্বারা মসলিনবসিল্ক এবং কটন কাপড় তৈরি হতো, কিন্তু সেই শিল্প বিনষ্ট হয় ব্রিটিশ শিল্পপতি এবং ব্যাবসায়ীদের জন্য। ব্রিটিশরা বাহুবলে উপনিবেশ এবং সাম্রাজ্য স্থাপন করে। ব্রিটেনের টেক্সটাইল শিল্পকে বাঁচানোর জন্য দরকার ছিল কাঁচা মালের তার জোগান হতো তাদের উপনিবেশ দেশ গুলো থেকে।ব্রিটেনের শিল্প বিপ্লবে দুটো সমস্যা দেখা যায় প্রথম টা হল কাঁচামাল এবং করার জন্যদ্বিতীয় টি হল উৎপাদিত জিনিস বাজার। আফ্রিকা এবং পাকভারত উপমহাদেশ ছিল এই কাঁচামাল রপ্তানির দেশ এবং একই সাথে বাজার।
মেয়েরা ঘরে ঘরে ওয়েভিং এবং স্পিনিং করতো আর পুরুষরা করতো চাষবাস । অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে ভারতের হাতে ছিল পৃথিবীর টেক্সটাইল ব্যাবসার ২৫% । ভারতের মিলগুলো বন্ধ হয়ে যাক এটাই ছিল ব্রিটেনের ইচ্ছা । উদ্দেশ্য নিজ দেশে তাদের মিল গুলো চালু থাকবে এবং তাদের বাজার হবে পাক ভারত। কাজ গুলো ভারতের মানুষে না হয়ে তাদের মানুষের হোক এটাই ছিল উদ্দেশ্য। খরা, বন্যায় ফসল না হলে পুরুষরা তাঁতে কাজ করে পুষিয়ে নিতো। কিন্তু তা বন্ধ হয়ে যাওয়াতে তারা ভিকেরীতে পরিণত হতো। অনেক তাঁতি মারাও যায়।
তখনকার কোম্পানির গভর্নর জেনারেল Bentinek নিজ দেশের প্রতি এতোই অনুগত ছিল যে এক জায়গায় লিখেছিলেন ‘ The bones of cotton weavers are bleaching the plains of India’ অর্থাৎ ব্রিটিশ রা এখানে আছে বলে জোর পুর্বক তাঁতিদের তাঁত বন্ধ করা হয়েছে এবং তার ফলস্বরূপ তারাকে না খেয়ে থাকতে হচ্ছে’ । ১৮৩০ সালে ব্রিটেন ভারতে ৬০ মিলিওন গজ সুতিবস্ত্র রফতানি করে। ভারত ঠিকই তুলা উৎপাদন করতো কিন্তু তা ব্রিটেনের কাঁচামাল জোগানের জন্য।
এই ছিল ব্রিটেনের শিল্প বিপ্লবের ফল যা ভারতীয়দের জীবনে প্রতিফলিত হয়েছিল।
🏁 দ্বিতীয় শিল্পবিপ্লব (১৮৭০-১৯১৪)
প্রথম শিল্পবিপ্লবের পর দ্বিতীয় শিল্পবিপ্লব আসে । এইসময় টেলিফোন, প্লেন, অটোমোবাইল, এয়ার ব্রেকস, পেট্রলিয়াম রিফ্রাইনিং, টেলিগ্রাফ, টাইপরাইটার, ট্র্যাকটর,শিকাগোর হাইরাইজিং বিল্ডিং, গ্যাস এবং বায়ু শক্তি দ্বারা চালিত ইঞ্জিন, ইলেকট্রিক জেনারেটরের সাহায্যে বাড়ি ঘরে বিদ্যুৎ জাওয়া। ব্রিটেন হল প্রথম দেশ ,যে কিনা জেনারেটর আবিষ্কারের করে ১৮৮১ সালে। ১৮৭৬ সালে গ্রাহামবেল টেলিফোন আবিষ্কার করে, থমাস এডিশন ১৮৭৯ সালে বাল্ব আবিষ্কার করে, ১৮৭৯ সালে ইলেকট্রিক রেল রোডের আবিষ্কার যাতায়াতের ক্ষেত্রে এক বিরাট পরিবর্তন আনে। ১৮৮০ সালে বেশির ভাগ ইওরপিয়ান শহর গুলোতে রাস্তায় ঘোড়ার গাড়ির বদলে ইলেকট্রিক বাস চলাচল আরম্ভ হয়। মার্কনি রেডিও ওয়েব আবিষ্কার করেন ১৯০১ সালে। যে ওয়েব আটলান্টিকের ওপারে চলে যেতে আরম্ভ করে।
প্রথম শিল্পবিপ্লব থেকে দ্বিতীয় শিল্প বিপ্লবের পার্থক্য হল প্রথমটি শুধুমাত্র স্টিম শক্তি দ্বারা টেক্সটাইল ম্যানুফ্যাকচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু দ্বিতীয়টি অটোমোবাইল এবং এডভান্স ইলেকট্রিক পাওয়ারের উন্নয়ন এবং তার ব্যাবহার। ইলেক্ট্রিসিটি আবিষ্কারের ফলে কমুনিকেসান এবং টেকনোলজির অনেক উন্নতি হয়।
🏁 তৃতীয় শিল্পবিপ্লব ( ১৯৬৯-১৯৫০)
১) ইলেক্ট্রনিক্স ২) টেলি-কমিউনিকেশন ৩) computers এর অগ্রগতি। দ্রতগতির কম্পুইটিং ক্ষমতা ব্যাবহার করে জেনারেটিং প্রসেসিং, এবং ইনফরমেসান শেয়ার করা।
🏁 চতুর্থ শিল্পবিপ্লব (২০০০ সাল থেকে এখনও চলমান):
আমরা এখন পর্যন্ত চলমান পর্যায়ে আছি চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের । Automation and data exchange in manufacturing technologies and processes, যার সাথে যুক্ত cyber physical system,Cloud computing Cognitive Computing, এবং artificial intelligence.
🏁 পাক-ভারতসহ পৃথিবীর অনেক দেশে ক্রমান্বয়ে শিল্প বিপ্লব হয়েছে কিন্তু তার শেষ পরিনতি কী এবং কীভাবে সব কিছুর উপর প্রভাব ফেলতে পারেঃ
ভালো দিকগুলো হল পৃথিবীর অনেক দেশ এখন শিল্প বিপ্লবের সুফল ভোগ করছে। জ্বালানি শক্তির ব্যাবহার অনেক বৃদ্ধি হয়েছে। মানুষকে এখন কায়িক পরিশ্রম করতে হয়না যা আগের দিনে মানুষকে করতে হতো। মানুষ এখন সন্তানকে ভালো খাবার দিতে পারে। গণতন্ত্র চালু হয় প্রশাসনিক ক্ষেত্রে । যাকে বলা হয় আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা । যেখানে রাষ্ট্রই করে মানুষের শিক্ষা, সুস্বাস্থ্যের ব্যবস্থা, চিকিৎসা, সামাজিক নিরাপত্তা, বেকারত্ব দূরীকরণ, পেনশন, বাসস্থানের ব্যবস্থা। মানুষ দীর্ঘ জীবন বেঁচে থাকতে পারে যা ছিল না শিল্প বিপ্লবের আগে।
তবে শিল্প বিপ্লবের উপকারিতা পাওয়ার জন্য মানুষকে দিতে হচ্ছে বিরাট মূল্য।
মানুষের চিন্তা চেতনা এতো দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে যা সমাজ ব্যবস্থাকে তার সাথে তাল মেলাতে struggle করতে হচ্ছে। একে ধরে রাখতে মানুষ অনেক সময় পেরে উঠেনা।
বেশি ইন্ডাস্ট্রি হওয়ার ফলে তা অনেক ঝুঁকি বাড়াতে পারে। সেই ঝুঁকি পরিবেশকে করে বিশাক্ত। যার ফলে সাগর, নদী, মাটি, আবহাওয়া, মাটির নিচের পানি, জীবজন্তু এবং মানুষের উপরে প্রভাব ফেলে এবং ঝুঁকি বাড়ায়।
আমরা জানিনা এর ভবিষ্যৎ কী । একমাত্র ভবিষ্যতই জানে এর ফলাফল। আমরা কি পারবো সব কিছুর সাথে ব্যাল্যান্স করে চলতে?
তথ্যসূত্রঃ
The Industrial Revolution,Matthew White
Encyclopadia Britannica
The History of concept, James HullMuntone, Stephanie
Richmond Vale Academy ,The Second Industrial Revoluntion
Shashi Tharoor,Inglorious Empire , What The British did to India
The condition of the working class in England, Friedrich Engels
What is industry 4.0 ,Mike Moore
The fourth Industrial Revolution, Schwab Klaus
ফটো ক্রেডিটঃ উইকিপিডিয়া।




















