স্ত্রী গৌরী দেবীকে লেখা মহানায়কের চিঠি
প্রিয় গজু,
টেলিফোনে যোগাযোগ করার বহু চেষ্টা করে যখন হতাশ হতে হলো– তখন তোমাকে চিঠি লিখতে বাধ্য হলাম। গত একমাস ধরে
তোপচাঁচির সমস্ত লাইন খারাপ। নিজে তিনদিন ধরে তাগাদা দিয়ে মিস্ত্রি আনিয়ে টেলিফোন ঠিক করে যখনTrunk call book করলাম আর তার কিছুক্ষণ পরে যখন খোঁজ নিতে গেলাম, বলল যে Trunk line এইমাত্র খারাপ হয়ে গেল। এখানে আসার পর থেকে উদয়াস্ত কাজ করে এত ক্লান্ত মনে হয় যে চিঠি লেখার ধৈর্য্য থাকে না।
যাইহোক আমার টেলিফোন নিশ্চয়ই পেয়েছ।
তোমার পাঠানো প্যান্ট-শার্ট আর গৌতমের ট্রাংক পেয়েছি। বেশ ভালো হয়েছে ষষ্ঠীর দিন আমি নিশ্চয়ই পরবো। আমাদের কাজ শেষ হয়ে যাবে
২১তারিখে তারপর তিন /চারদিন এখানেই বিশ্রাম নিয়ে কলকাতায় ফিরব। শরীর স্বাস্থ্য মোটামুটি ভালই আছে। তোমরা সবাই ভালো থেকো। তাড়াহুড়োর মাথায় আসবার আগে মা’র সঙ্গে দেখা করা হয়ে উঠল না। মাকে বলো যেন কিছু মনে না করে। গৌতম দোকানে ঠিকমতো যাচ্ছে তো? গাড়ি আনিয়েছো? আজকে ‘অমানুষ’ ছবির মুক্তি। কি হবে কে জানে। যাই হোক সব খবরাখবর নিয়ে আমাকে চিঠি লিখো। আমি ট্রাংকলের চেষ্টায় আছি। লাইন পেলে সব জানাব। ছুটকি আর ঝিমলি এখানে আছে ওরা বোধহয় ২০ তারিখে চলে যাবে সম্ভবত ট্রেনে।
রূপকথা,
আমি ফিরে গিয়ে লক্ষ্মীপুজোর সব ব্যবস্থা করব।
আশা করি পুজো ভালোই কাটবে। মন খারাপ করো না। ভাল থেকো। ভালোবাসার আদর সবকিছু নিও। গৌতমকে আমার ভালোবাসা ও স্নেহাশীব্বার্দ জানিও।
তোমার বণিক।
★গৌরী (হাতি মেরে সাথী),
পুজো কেমন কাটালে? গলা ধরেনি? গৌতম কেমন আছে? কাশী থেকে ফেরার সময় আর ফোন করে উঠতে পারলাম না। যাই হোক, ওপারের ঠিকানায় আছি। জায়গাটা বেশ নিরিবিলি। বাংলোটাও বেশ আধুনিক। কেবল টেলিফোন নেই। জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়ের আজ আসবার কথা। শুটিং আরম্ভ হওয়ার কথা ১৫ অক্টোবর। ২৫ ফিরে যাবো। আর বাইরে ঘুরতে ভালো লাগছে না। তোমার শরীর ভালো আছে তো? আমার জন্য চিন্তা করো না। আমি ভালো আছি। মজুমদার হয়তো অক্টোবর মাসের দরুন তিন হাজার টাকা দেবে। ওটার সঙ্গে আলিপুর ও ভবানীপুর বাড়ির ভাড়া যোগ করলে ছয় হাজার টাকা হয়। চালিয়ে নিও। বাকি বকেয়া যা আছে, ফিরে গিয়ে হিসাব করবো। পাড়ায় কোনো গোলমাল নেই তো? তোমার মা আছেন, না চলে গেছেন? যদি থাকেন, আমার বিজয়ার প্রণাম জানিও। খোকা, ছুটকি ওরা কেমন আছে? জামাই আর তৃণা কি আসে? জামাইয়ের চাকরি কি হলো? ভালো থেকো। ফিরে গিয়ে আলাপ, প্রলাপ সব হবে। আসি?
রূপকথা,
ভালোবাসা জেনো। গৌতমকে আমার শুভেচ্ছা ও প্রীতি জানিও।
ইতি
উত্তম (বণিক)।
★গৌরী দেবীকে উত্তম কুমার অর্ধাঙ্গিনী স্বীকার করে গেছেন আজীবনই। অন্তত চিঠিপত্র সে কথাই বলছে। বোম্বে থেকে সেই সময়ে গৌরী দেবীকে লেখা উত্তমের অপর একটি চিঠি।
প্রিয় গৌরী (গজু),
মানুষ ভাবে এক, হয় আর এক। ভেবেছিলাম যে বোম্বে, মাদ্রাজকে কেন্দ্র করে কলকাতার অর্ধকৃত ছবিগুলো শেষ করব। কিন্তু সে গুড়ে বালি পড়ল, যখন জানতে পারলাম যে ওরা কেউই কলকাতা ছেড়ে আসতে রাজি নয়। আরো হতাশ হয়ে পড়লাম যখন দেবেশ খবর দিলেন যে, প্রোডিউসাররা এর পরের মাস থেকে আর টাকা দিতেও রাজি নয়, যদি আমি কলকাতায় ফিরে না যাই। দুটো ঘরওয়ালা একটা ফ্ল্যাটও দেখেছিলাম তোমাকে এনে রাখবো বলে। কিন্তু টাকাই যদি না আসে, কার ভরসায় আমি ফ্ল্যাট নেব? আর আমিই বা না খেয়ে কত দিন এখানে পড়ে থাকবো?
নানা রকমের ভাবনা ছেঁকে ধরেছে। কী করবো বুঝে উঠতে পারছি না। এও ভেবেছিলাম যে, শক্তি সামন্ত হয়তো কিছু করলেও করতে পারে। সে বিষয়ে ওর সঙ্গে কথা হয়েছিল। কিন্তু এমনটাই ভাগ্য দেখো যে শক্তি সামন্তও ঠিক সেই সময়ে পড়ে হাসপাতালে ভর্তি হলো।
কোনো দিক দিয়ে কোনো আশা-ভরসা পাচ্ছি না। দেবেশ দয়া করে ওর যে ফ্ল্যাটে থাকতে দিয়েছে, সেটাও ১৪ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ছেড়ে দিতে হবে। কেননা, রঞ্জনা পুজোর ছুটিতে এখানে থাকবে। অগত্যা আপাতত আলোর ফ্ল্যাটে গিয়ে ওঠা ছাড়া আর কোনো গত্যন্তর খুঁজে পাচ্ছি না। অসীমকে পাঠিয়েছিলাম। অসম্ভব খরচা বাড়িয়ে লাভ কী? অসীমের কাছে আমার দুরাবস্থার কথা সব জানতে পারবে। নীতাদিকে জিজ্ঞেস করে আমাকে যতো শীঘ্রি পারো জানাবে যে, ওখানে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে কোন সময়টা প্রশস্ত। তাহলে যতো শীঘ্রি পারি আমি এখান থেকে ফিরে যাবো। এখানে আর একেবারে ভালো লাগছে না।
তুমি চারতলা বাড়ির ভাড়াটা ও আলিপুরের বাড়ির ভাড়াটা নিয়ে কোনোরকমে যদি চালিয়ে দাও, আমার মনের এবং শরীরের ভীষণ উপকার হবে। মায়ের টাকা ও আমার এখানকার শুধু খাওয়ার টাকাটা অসীম ওখান থেকে যা হোক করে বলেছে পাঠিয়ে দেবে।
তারপর জানি না কী হবে? সবাই চোখের সামনে এক রকম। আর চোখ ফেরালেই অন্য রকম। এর ওপর তুমি যদি এখানে আসার ও থাকার বায়না করো, তাহলে ভীষণ ক্ষতি। কেননা, এখানে ফ্ল্যাট নিতে গেলে কমপক্ষে ৬০০ টাকা জমা দিতে হবে। ছবির এখানে চেষ্টা করছি। কাজের চেষ্টা চলছে। যদি একখানা বাংলা ছবিও এখানে করতে পারি, তাহলে আমি কথা দিচ্ছি, নিশ্চয়ই এখানে নিয়ে আসবো। তবে কাজ কিছু না হলে বা পেলে আমাকে ফিরে যেতেই হবে।
রূপকথা গৌতমের জন্মদিন বেশ ভালোই কেটেছে। ওরা এখানে খুব ঘুরে বেড়িয়েছে। তুমি একেবারে মন খারাপ করো না। সময় যখন খারাপ পড়ে, তখন মুখ বুজে সবকিছু সহ্য করতে হয়। আমি জানি, এই চিঠি পড়ে তোমার খুব মন খারাপ হয়ে যাবে। কিন্তু উপায় একটা কিছু না বের করলে কী করে কী হবে বলো? দু’একটা বাংলা ছবি এখান থেকে হওয়ার কথা যে হচ্ছে না, এমনও নয়, হচ্ছে। তবে যতোক্ষণ কাগজপত্রে সই-সাবুদ না হচ্ছে, বিশ্বাস কী বলো? তুমি একদম মন খারাপ করো না। এই সময় তুমি মন খারাপ করলে শরীরের দিক থেকে আমাদের দু’জনেরই ক্ষতি। আমার জন্য অনেক কষ্টই তো সহ্য করলে, আর এই কটা দিন একটু সহ্য করো। মায়ের খবরাখবর করো। আর বুড়ো আতঙ্কের বোঝা না বাড়িয়ে আমার যেন একটু খবরাখবর করে। সপ্তাহে যেন একখানা করেও চিঠি দিও।
ইতি
উত্তম (বণিক)।
সূত্র: অন্তর্জাল।












