একদিন আমিও চলে যাব।। নাসির আহমেদ কাবুল
ছেলেবেলায় উঠানে আমাদের ঘরের সামনে
থই থই বৃষ্টির জলে কাগজের নৌকা ভাসাতাম।
সকালে কাচারি ঘরে বসে অপেক্ষা করতাম
রানার কখন আসবে,
প্রতিদিনই আমাদের ছোট্ট পোস্ট অফিসে রানার আসতো মানিঅর্ডার ও চিঠির বোঝা নিয়ে।
রানারের হাতে থাকতো বল্লম, কাঁধে থাকতো ব্যাগ-
সুকান্ত যেমন বলেছিলেন!
রোজ রোজ রানারকে শুধাতাম, আমার চিঠি আসেনি কোনও?
রানার হেসে বলত, আজ আসেনি, কাল আসবে হয়তো।
প্রথম চিঠি লিখেছিলাম সুহাসিনীকে, শেষটাও তাকেই।
লিখেছিলাম আমার এটাসেটা অনেক কথা।
সুহাসিনী চিঠি পেয়েছিল ঠিকই, উত্তর দেয়নি কোনো।
সুহাসিনীদের নীরবতা অন্তরে আগুন জ্বালায়
ওরা বোঝে না কখনো!
রানার মহব্বত আলীর কথা মিথ্যে হয়েছে প্রতিদিন_
কাল কখনো আজ হয়নি, আমার নামে চিঠি
কোনোদিনই আসেনি আর!
এসবই আমার একান্ত নিজের, ছোটোবেলা ও বড়োবেলার কষ্ট!
বাড়ির সামনে ছিল বেশ বড়ো একটি পুকুর,
তিন পাড়ে ছিল গোটাআষ্টেক তালগাছ
শ্রাবণ ভাদ্র মাসে গাছ থেকে তাল পড়ত পুকুরে
দৌড়ে গিয়ে জলে ঝাঁপিয়ে পড়তাম সবার আগে, পুকুরের জল থেকে তাল কুড়াতে আমার সঙ্গে
পেরে উঠত না কেউ।
আমার ছেলেবেলার সেই পুকুর আজও আছে,
জীর্ণ হয়েছে কাচারিঘর, সেই তালগাছ নেই একটিও! তাদের জায়গা জুড়ে এখন অন্য গাছ,
ওরা চেনে না আমাকে বহু বছর দেখেনি বলে।
আমারও অচেনা ওরা। ওদের কী নাম শুধালে
পাতার ঘ্রাণ শুঁকে মা বলে দিতে পারতেন
আদিঅন্ত!
মা আজ আর নেই! বাবাও ওপারে।
এসব ছোটখাটো কতজা শুধাবারও কেউ নেই আমার,
মা-বাবা কারো থাকেন না চিরদিন,
তবে কষ্টগুলো থেকে যায় আগের মতন।
কিশোরবেলায় আমাদের গানের শিক্ষক ছিলেন
বাঁশিরাম শীল–পেশা ছিল চুলকাটা, খৌরি করা;
খুব ছোটো পেশা বলে সম্মান ছিল না তার কারো কাছে।
বাবার কাছে শিখেছিলাম সব মানুষই সমান,
কেউ ছোটো না, কেউ বড়োও নয়।
বাঁশিদাকে একদিন সন্ধ্যায় বাবা বাসায় নিয়ে এলেন
আমাদের গান শেখাবেন বলে, সঙ্গে ছিলেন ধলুদা।
ধলুদা তবলা বাজাতেন।
তিনি তবলার বোল শেখালেন তেরে কেটে তাক তাক, ধান ধিন না/ না থুন না।
বাঁশিরাম শীল–আমাদের বাঁশিদা সরগম-এ
হাতেখড়ি দিলেন সা-রে-গা-মা-পা…
আমি ভুলিনি আজও সেই সাতটি স্বর
আর বাঁশীদা ও ধলুদাকেও।
তারা আজ আর কেউ নেই পাশে, বাবাও চলে গেছেন;
মসজিদের পাশে কবর তার,
ধলুদা গত হয়েছেন বছর ছয়েক আগে
বাঁশিদা ওপার বাংলায় গেলেন, তারপর অন্ধ হলেন-
এটুকুই জানি, আর কিছু না!
আমাদের সময় তাপসী পাল বেশ গাইত নজরুল, রবীন্দ্র এবং আধুনিকও,
একদিন পূজার নাড়ু খেতে ডাকল বাসায়।
তার কয়েকদিন পর উধাও হয়ে গেল সেও,
না বলেই চলে গেল ওপার বাংলায়!
দুই বাংলার মধ্যে কাঁটাতার আরও বেশি রক্তঝরায়
নিরবে নিভৃতে।
সম্প্রতি শুনেছি তাপসী আর বেঁচে নেই।
হারানোর বোঝা ভারি হচ্ছে দিনকে দিন,
কতজন চলে গেলেন হিসাবের বাইরে-বন্ধু স্বজন,
শুধু বিস্মৃতির ওপার থেকে মাঝে মধ্যে সুর ভেসে আসে সকরুন; সে সুর মধ্য রাতে উন্মনা করে।
সে সুর দুই চোখে জল আনে, কাঁদায় খুব।
জানালার খড়খড়ি খুলে শীতল নিঃশ্বাস পাই
কানের কাছে,
পায়ের শব্দ এসে থামে শিথানের পাশে।
কারা যেন রাত গভীরে চুপি চুপি এসে ওদের সঙ্গী করে নিতে চায় আমাকে। হয়তো আমিও চলে যাব একদিন
আর কত একা একা মৌনবিষাদের এই হাসিখেলায়!
হয়তো স্মৃতিবিস্মৃতির চেতনায কারো কারো কাছে রয়ে যাব তাদের প্রতিদিনের রোজনামচায়!












