পুণ্ড্র বর্ধনের অজানা গল্প
১২E বঙ্গ আর বাঙালি ,পুণ্ড্র বর্ধনের অজানা গল্প 

১২E ‘বঙ্গ’ আর ‘বাঙালি’
পুণ্ড্রবর্ধনের অজানা গল্প
‘পুণ্ড্রনগর বা পুণ্ড্রবর্ধন’ একটি শক্তিশালী জনপদ (12 E)
কীভাবে পুণ্ড্র নগরে অনার্যদের ক্ষমতা চলে যায় আর্যদের কাছে।
পুণ্ড্রবর্ধন আর বঙ্গ, বঙ্গের জনপদগুলির অন্যতম এবং পুরানো জনপদ ।
ভারতবর্ষে আর্যদের আগমন ঘটে প্রায় খ্রিস্টপুর্ব তিনশত বছর আগে। প্রথমে তারা পূর্ব দিকে আসে নাই। কারণ আর্যদের বাসস্থান ছিল বঙ্গ থেকে অনেক দূরে ।
প্রথম তিনশত বছর অত্যন্ত ধীর গতিতে হলেও বঙ্গ এবং পুণ্ড্র প্রভৃতি জনপদে আর্য সভ্যতা অনুপ্রবেশ ঘটতে থাকে।
খ্রিস্টপুর্ব ৬ষ্ঠ শতকে এই সময়ে ধর্মীয় ক্ষেত্রে এক বিরাট পরিবর্তন আসে পাকভারতে।
এই সময়ে হিন্দু ধর্মের বিকাশ ঘটে এবং তাদের সাথে মিলে মিশে স্থানীয় অধিবাসীদের মধ্যে বৈদিক আচার-আচরণ প্রবেশ করতে থাকে।
বঙ্গে ছিল তখন অনার্য জাতিদের বাস এবং তাদের ছিল নিজস্ব ধর্ম যা কিনা প্রকৃতিকে বিশ্বাস আর ছিল নিজস্ব ভাষা আর প্রথা । যা তারা ছাড়তে চায়নি।
বৈদিক হলো আর্যদের ধর্ম ।
জৈন এবং বৌদ্ধ ধর্মের বিকাশ:
ঠিক এই সময়ে এই অঞ্চলে জৈন এবং বৌদ্ধ ধর্মেরও উদ্ধব হয়।
এইভাবে পুণ্ড্রবর্ধনে সম্ভবত হিন্দু, জৈন আর বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারের জন্য প্রচারকের আগমন হতে থাকে। এই ধর্ম প্রচারের মাধ্যমে ক্রমে ক্রমে আর্য সভ্যতা এবং সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ক্রমাগত ভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকে।
হিন্দু ধর্মপুস্তক পুরাণ অনুযায়ী পুণ্ড্র নগরের সীমানা:
উত্তরে মলদ অর্থাৎ মালদহ ও মৎস্য দেশ অর্থাৎ দিনাজপুর, পূর্বে করতোয়া নদী, দক্ষিণে পদ্মা নদী, পশ্চিমে মহানন্দা নদী ।
আর এর মধ্যবর্তী স্থান হলো প্রাচীন পুণ্ড্র দেশ। তাদের মহাকাব্যগুলোতে বারে বারে উল্লেখ আছে পুণ্ড্র সম্বন্ধে । আর তা হলো পুণ্ড্র অঞ্চলে বাস করে অসভ্য ম্লেচ্ছ জাতি।
সব জায়গায় তারা তুলে ধরেছে একটা ঘৃণার ভাব পুণ্ড্র সম্বন্ধে।
আর্য দ্বারা অনার্য পুণ্ড্রদেশ দখল:
পুণ্ড্র রাজ্যের রাজাদের নাম জানা যায়নি তবে শেষ রাজা ‘পুণ্ড্রক বাসুদেব’ নামে একজন শক্তিশালী নরপতির নাম আসে পুর্ব ভারতের রাজনীতিতে । যিনি ছিলেন অনার্য নরপতি ।
সম্ভবত খ্রিস্টপুর্ব ৪র্থ শতকে “পুণ্ড্রক বাসুদেবকে যুদ্ধে পরাজিত এবং নিহত করে আর্য নেতা দ্বিতীয় পাণ্ডব ভীম। এবং আর্য আধিপত্য বিস্তার করে।
বেদ পুরাণ ( আর্যদের ধর্মের বৈদিক ধর্ম পুস্তক ‘বেদ আর পুরাণ’) থেকে ধারাবাহিক ভাবে পুণ্ড্রের অনার্য রাজনৈতিক ইতিহাস জানা সম্ভব নয়। তবে সেখান থেকে ধর্মের বিবর্তন আর সামাজিক ইতিহাস জানা যায় ।
পুণ্ড্রবর্ধন যখন মৌর্যদের দখলে:
সময়টা যীশু খ্রিস্টের জন্মের ৪০০ বছর আগে, যখন আলেকজান্ডার ভারতবর্ষ ত্যাগ করল তার কিছুদিন পরে ‘চন্দ্র গুপ্ত মৌর্য’ পশ্চিম দিক থেকে গ্রিক বাহিনীকে বিতাড়িত করে মৌর্য রাজত্বের ভিত্তি স্থাপন করে।
তারপরই তিনি পাটালি পুত্রের শক্তিশালী রাজা ধননন্দকে পরাজিত করে বিশাল মৌর্য সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ হন। ভারত এবং বাংলাদেশে
‘পুণ্ড্র নগর’ সেসময় মৌর্যদের পূর্ব অঞ্চলের রাজধানীর মর্যাদা লাভ করে।
এই তথ্য সামসময়িক জৈন ধর্মের গুরু ‘ভদ্রবাহু’র লেখা “কল্পসূত্র” থেকে প্রাপ্ত ।
রাজা অশোক ছিল, মৌর্য সাম্র্যাজ্যের তৃতীয় সম্রাট । খ্রিস্টপুর্ব ২৬৮ থেকে ২৩২ পর্যন্ত ছিল তার শাসনকাল । মৌর্য সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা চন্দ্র গুপ্তের পৌত্র এবং বিন্দুসারের পুত্র ।
আফগানিস্তান বাংলাদেশের অনেক অংশ ছিল তার রাজত্ব ।
আর সে সময়ের পুণ্ড্রবর্ধন ছিল তার রাজত্বের অংশ । সেসময় বহু জৈন ধর্মের মানুষ পুণ্ড্র নগরে বাস করত এবং তাদের অনেককে মেরে ফেলে রাজা অশোক । কারণ তারা বৌদ্ধ ধর্মের বিরোধিতা করেছিল। যা পাওয়া যায় ‘আশোকা বদনে’।
গুপ্ত আমল এবং পুণ্ড্র নগর:
খ্রিস্টীয় ৪র্থ শতকের প্রথম দিকে সম্ভবত মহাস্থানগড় গুপ্ত অধিকারে আসে।
চন্দ্র গুপ্তের পুত্র সমুদ্র গুপ্ত এবং তার পুত্র দ্বিতীয় চন্দ্র গুপ্ত স্থানীয় রাজাদের পরাজিত করে সমগ্র বঙ্গ গুপ্ত অধিকারে আনে । সেসময় পুণ্ড্রবর্ধন রাজ্য উত্তরে হিমালয় থেকে দক্ষিণে সুন্দরবন পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।
প্রত্নতাত্ত্বিক খননে পাওয়া গুপ্ত আমলে যা যা জিনিস পাওয়া যায় তা হলো মৌর্য আমলে মহাস্থানগড়ের চারদিকে যে উঁচু প্রতিরক্ষা প্রাচীর করা হয় তার উপরে গুপ্ত আমলে টালি দেওয়া হয়। তাছাড়া বৈরাগীর ভিটা এবং গোবিন্দ ভিটা, গোকুল মেরে খননের ফলে গুপ্ত আমলের অনেক স্থাপত্য নিদর্শন ধ্বংসের মধ্যে পাওয়া যায় । তা হলো পোড়ামাটির ফলকচিত্র, সিল, পোড়ামাটির দণ্ডায়মান সুর্য মূর্তি, ভাসুবিহার থেকে বুদ্ধ মূর্তি, বলাই ধাপ থেকে সোনা পাতে মোড়া মঞ্জুশ্রী মুর্তি যা কিনা সমৃদ্ধ গুপ্ত আমলের পরিচয় দেয়।
প্রথম বাঙালি রাজা:
প্রথমে এই বঙ্গে ছিল ছোট বড়ো জনপদ ।
যেখানে কেন্দ্র থেকে শাসন করা হতো না। একেক জনপদে একেক গ্রুপ বাস করত। অনেক সময় ছোট জনপদগুলো বিলীন হয়ে যেত পাশের বড়ো জনপদের সাথে।
তারপর এই জনপদ গুলো রাজ্য বিস্তার করে কেউ একজন শক্তিশালী ব্যক্তি শাসক হয়ে নিজেকে সেই রাজ্যের রাজা বলে ঘোষণা দিত।
এই বঙ্গে সেই রকম প্রথম বাঙালি রাজার উত্থান হয় এবং তিনি হলেন “শশাঙ্ক” ।
তার আগে বঙ্গ মৌর্য বা গুপ্ত বংশের দ্বারা শাসিত হয়েছিল।
পাল (বাঙালি শাসক) সাম্র্যাজের প্রতিষ্ঠার আগে সপ্তম শতক থেকে অষ্টম শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত প্রায় দেড়শত বছর সময়কে সামন্ত যুগ বলা হয়। “সামন্ত অর্থাৎ সীমানা রক্ষাকারী। ষষ্ঠ শতকের শেষ দিকে বিশাল গুপ্ত সাম্রাজ্যের ভিত দুর্বল হয়ে পড়ে । তখন সামন্ত রক্ষাকারী সামন্তরা মহাসামন্ত বা মহারাজা উপাধি নিয়ে নিজ অঞ্চল শাসন করতে থাকে।
রাজা শশাঙ্ক ছিল মহাসামন্ত এবং তিনি উত্তর বঙ্গের শক্তিশালী গৌড় রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন।
এ রাজ্যের পরিধি বাংলা ছাড়িয়ে বহু দূর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। শশাঙ্কের রাজধানী ছিল মুর্শিদাবাদের কর্ণসুবর্ণ। পুণ্ড্র নগর বা মহাস্থান তখন তার একটি শাসনকেন্দ্র ছিল।
হর্ষ বর্ধন এবং তার মিত্র ভাস্কর বর্মার মিলিত আক্রমনে শশাঙ্ক কর্ণসুবর্ণ ত্যাগ করে পুণ্ড্র নগরে আশ্রয় নেয় এবং সেখানেই শশাঙ্ক মৃত্যু বরণ করেন ।
তার মৃত্যুর পর গৌড় রাজ্য ধ্বংস হয়ে যায়।
মাত্যস্যায়ন যুগ:
পরবর্তী এক শত বছর বাংলাকে কেন্দ্র করে শাসন করার মতো কেউ ছিল না। চার দিকে ছোট ছোট ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্য গড়ে ওঠে এবং সামন্তগণ নিজেকে রাজা ঘোষণা করে। পরের দিন দেখা যায় তার মস্তক কেটে ফেলে আর একজন নিজেকে রাজা ঘোষণা করছে। তার আবার মস্তকচ্যুত হতে সময় লাগে না। চার দিকে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় ।
পাল আমলে পুণ্ড্রবর্ধন:
পালবংশ ছিল বাঙালি অনার্য ।
পাল রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা ‘গোপাল’ যিনি জন্ম গ্রহণ করেন পুণ্ড্র নগরে। তার পিতা ‘ব্যপাট’ পুণ্ড্রবর্ধনের সামন্ত রাজার সেনাপতি ছিলেন।
গোপাল:
তার সাহায্য নিয়ে তার পুত্র ‘গোপাল’ ৭৫০ খ্রিষ্টাব্দে বাংলার পাল রাজ্যে স্থাপন করে।
ধর্মপাল:
ধর্মপাল (৭৭০-৮১০) নিজ বাহু বলে বাংলা বিহার ছাড়িয়ে বিরাট একটি সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন। যা এর আগে কোনো বাঙালি রাজার পক্ষে সম্ভব হয়নি।
দেবপাল:
দেবপালের সময় বাংলা উন্নতির চরম শিখরে ওঠে।
দুর্বল হওয়া আরম্ভ:
দেবপালের মৃত্যুর পর তার উত্তরাধিকারগণ দুর্বল হয়ে পড়ে । রাজা মহেন্দ্র পালের পর কম্বজ আক্রমণের ফলে পালবংশের ক্ষমতা হ্রাস পায় এবং কিছু কিছু অংশ হাত ছাড়া হয়।
করুণ অবনতি:
মহিপালের আমলে ১০২৬ সালে রাজেন্দ্র চোলের নিকট মহিপাল পরাজিত হন। দিব্যক নামক এক কৈবর্ত প্রধান মহিপালকে পরাজিত ও নিহত করে।
তার কিছুদিন পরে রামপাল ভীমকে পরাজিত ও নিহত করে, পিতৃভূমি পুরুদ্ধার করে। ১১৯০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত রাজাগণ ক্ষমতায় থাকে। একাদশ শতকেই সেন রাজাদের হাতে ক্ষমতা চলে যায় ।
পুণ্ড্র নগর উন্নয়ন এবং পাল আমল:
পাল রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা গোপাল পুণ্ড্রবর্ধনে জন্ম গ্রহণ করেন । তার পিতা ব্যাপট পুণ্ড্রবর্ধনের সামন্ত রাজার সেনাপতি ছিলেন। তার সাহায্য নিয়ে তার পুত্র গোপাল ৭৫০ খ্রিষ্টাব্দে বাংলায় পাল রাজত্ব স্থাপন করেন।
পাল আমলে বিশাল বিশাল বৌদ্ধস্তূপ এবং অন্যান্য স্থাপনা পুণ্ড্র নগরে স্থাপন হয়।
কিন্তু রামপাল ‘রামাবতি’তে রাজধানী সরিয়ে নিলে তারপর থেকে মহাস্থানের পতন হতে থাকে।
সেন আমল এবং পুণ্ড্র নগর:
সেন আমলে তেমন স্থাপনা পাওয়া যায়নি। (১০৯৫-১১৫৫) রাজা পরশুরাম ছিল শেষ রাজা। সে খুব নিষ্ঠুর ছিল। তারই সেনাপতি আর ঝাড়ুদারের বিশ্বাস ঘাতকতা করে মুসলমান ধর্ম গ্রহণ করে এবং মাহিসাওয়ারকে সহযোগিতা করে। রাজার পরাজয় হয় এবং নিহত হন ।
মুসলমান আমল:
শাহ সুলতান মাহিসাওয়ার (১৬৮৫)-এর আমলে একটি মাজার আর একটি মসজিদ ছাড়া তেমন কিছু চিহ্ন পাওয়া যায়নি ।
ইংরেজ আমল:
১৭৭৬ সালে ফকির সম্প্রদায় এর মাস্তানা হয়। ফকির মজনু সাহেবের মৃত্যুর পর মহাস্থানগড় নিস্তব্ধ নিস্তরঙ্গ একটি গ্রামে পরিণত হয়।
হুসনুন নাহার নার্গিস












