Bunohash Banner

প্রাচীন বাংলার পুন্ড্রবর্ধন একটি শক্তিশালী জনপদ

বঙ্গ আর বাঙালি শেকড়ের খোঁজে ,প্রাচীন বাংলার পুণ্ড্রবর্ধন একটি শক্তিশালী জনপদ 

 ‘বঙ্গ’ আর ‘বাঙালি’ শেকড়ের খোঁজে (পর্ব ১২ D)
“পুণ্ড্রবর্ধন ” বঙ্গের সবচেয়ে পুরাতন শক্তিশালী জনপদ
কোথায় কোথায় এর উল্লেখ আছে? কে ছিল অনার্য রাজা? কেন হারিয়ে গেল? আর্য রাজারা কবে আসলো? অনার্য সম্বন্ধে তাদের ধারণা কী?
বঙ্গ অনার্যদের বাসভূমি । অনার্যদের শ্রমে ঘামে তিল তিল করে গড়ে ওঠা এই নগর হয় পুণ্ড্র নগরের সৃষ্টি।
প্রমত্তা করতোয়া নদীর তীরে গড়ে ওঠা ছিল বন্দর নগরী “পুণ্ড্রবর্ধন” ।
পৃথিবীর যে-কোনো নগর গড়ে ওঠার পেছনের কারণ হলো সেই স্থানের সারপ্লাস ফসল অন্য স্থানে বিক্রি করার জন্য ব্যাবসা বাণিজ্যের প্রসার।
বিভিন্ন পর্যটকদের বিবরণ থেকে জানা যায় মাঠ ভরা আখের ক্ষেত, কার্পাস তুলা আর রেশমের চাষ ,অবারিত ধানের ফসল ভরা জমি আর শাক-সবজির বাড়-বাড়ন্ত উৎপাদন।
চারদিকে আখ থেকে রস আর রস থেকে গুড় তৈরির রমরমা কারবার, কার্পাস আর রেশম থেকে সূতা কাটা আর সুতা দিয়ে বস্ত্র বয়নের শব্দ।
এগুলোকে ঘিরে মানুষের বসতি তার সাথে আরও অন্য পেশা যেমন আর্টিস্ট, ধর্মযাজক, পাথর কেটে মূর্তি বানানো, মাটির তৈজসপত্র বানানো, আর তা পরিচালনা করতে শাসকের উৎপত্তিই হলো নগরায়নের মূল উৎস ।
এ ভাবেই এগিয়ে যাচ্ছিল পুণ্ড্র নগরের অগ্রসর ভূমিকা। এই নগরের রমরমা এগিয়ে যাওয়া সহ্য হয়নি আশপাশের আর্য রাজাদের । তারপরে যা হয় তাই হলো। অর্থাৎ আক্রমণ দখল ,পরাজিত। আক্রমণে বাধা সৃষ্টি হয় বারবার। আর তখনই তকমা জুটে অনার্যদের কপালে আর্যদের দ্বারা । দস্যু, ম্লেচ্ছ, ডাকাত, অসভ্য ইত্যাদি।
যেখানে যেখানে উল্লেখ আছে পুণ্ড্র নগর এবং পুণ্ড্র জাতির কথা:
উত্তরবঙ্গে পুণ্ড্র নগর সবচেয়ে পুরানো একটি জনপদের রাজধানী ।
যীশু খ্রিস্ট জন্মের বহু শতাব্দী পূর্বে পৌণ্ড্র বর্ধনের নিকট পুন্ডারিক নামক বণিক শাখার সন্ধান জৈনদিগের “কল্পসুত্রে” পাওয়া যায় । যেখানে পুণ্ড্র জাতের উল্লেখ আছে।
ঋক বেদে “ঐতরেয় ব্রাহ্মণে” পুণ্ড্রের উল্লেখ আছে। এখানে প্রাচীন অধিবাসীগণ আজও পুণ্ড্র নামে এখানে বাস করে।
মহাভারতের নানা স্থানে পুণ্ড্র জাতির উল্লেখ আছে। “শান্তি পর্বে ” ৬৫তম অধ্যায়ে পুণ্ড্রদিগকে দস্যু বলা হয়েছে।
নিচে শান্তি পর্বের পঙ্‌ক্তি:
“পন্ড্রা পুলিন্দা রমঠাঃ ্কাম্বোজা স্বৈর্রশঃ 
মদ্বিবৈস্বচ্ছ কতঅং স্থাপ্যঃ সব্বৈ বৈ দস্যু জীবন”
এর অর্থ এরা অর্থাৎ পুণ্ড্ররা “যুদ্ধ বিশারদ দস্যু ছিল” । 
ভগবতে পুণ্ড্রকে বলা হয়েছে “অণুর বংশীয়” ।
ষষ্ঠ শতাব্দীতে শবর জাতি হিমালয়ের উত্তর পুর্ব দিক থেকে ভারতে প্রবেশ করে। কিন্তু আর্য দের আগমনে পুণ্ড্র ত্যাগ করে মধ্য ভারত, উড়িষ্যার জঙ্গলে চলে যায় । এরা “পুণ্ড্র শবর” নামে এসব এলাকায় বাস করতো । আর যারা সেখানে থেকে যায় তারা “পুণ্ড্র” নামেই আছে এবং তাদের নামেই “পুণ্ড্র নগর” হয়েছে।
ভগবতে নবম স্কন্ধে আছে “ভরত রাজা” আব্রাহ্মণ নরপতিকে জয় করেন ।
ভগবতের একটি পঙ্‌ক্তি:
“কিরা তহু মান যব নান পৌন্ড্ররান কখান, খসান, শকান, ও অব্রাহ্মণ পাংশ্চাহন “ম্লেচ্ছান”
অর্থাৎ এই পুণ্ড্রকে তারা ম্লেচ্ছ, যবন, এসব বলে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করছে ।
এবার আসা যাক বোধায়ন স্মৃতিতে কী বলা হয়েছে: সেখানে বলা হয়েছে পুণ্ড্র এবং বঙ্গতে প্রবেশ করলে আর্য পুরুষকে প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে। অর্থাৎ শুদ্ধ হতে হবে।
এই নিচুভাবে তখনই ভাবা হয় যখন মানুষ তাদের কাছে পরাজিত হতে থাকে ।
পদ্ম পুরাণে “পোন্ড্র” এবং “পুণ্ড্র” দুটি দেশের নাম আছে।
জৈনদের ধর্ম গ্রন্থ “কল্প সূত্রে” এবং কৃষ্ণ দাসের “মগব্যাক্তি” গ্রন্থে, পুণ্ড্র দ্বীপে শকদ্বীপী ব্র্রাহ্মণগণ খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীতে জৈন ধর্ম পালন করে “পুণ্ডরীক” নাম গ্রহণ করে।
এই ছিল বিভিন্ন জায়গায় পাওয়া পুণ্ড্র এবং পুণ্ড্র জাতি সম্বন্ধে যা পাওয়া গেছে তার বিবরণ।
এখন দেখব পুণ্ড্র রাজ্যটি কোথায় তার বিবরণ এবং কীভাবে বলা আছে:
করতোয়া এবং মহানন্দা পুণ্ড্র রাজ্যের পূর্ব এবং পশ্চিম সীমার নদী ।
“মহাভারতের” “বন পর্বে” ২৫ অধ্যায়ে লেখা আছে
“পুনরাবর্ত্ত নন্দাং চ মহানন্দাআং চ ব্যবৈ, লোওহিত্য বিধিবৎ স্নাতা পুণ্ড্ররি কফলং লভেৎ ” 
অর্থাৎ ব্রহ্মপুত্র (লৌহিত্য) এবং মহানন্দার মধ্যবর্তী স্থানে পুণ্ড্র নগর । যেখানে প্রচুর ফসল উৎপাদন হয় । এখানে পুণ্ড্র দেশের প্রশংসা করা হয়েছে ।
মহানন্দার পশ্চিম পাড়ে আর্য এবং পূর্ব পাড়ে অনার্য বংশীয় লোকের বাস ছিল ।
করতোয়া সেসময় ব্রহ্মপুত্র নদের চেয়ে প্রকাণ্ড আর বিশাল নদী ছিল। দেখা যায় “পুরাণে” করতোয়া নদী ব্রহ্মপুত্র নদ অপেক্ষা বেশি বেশি উল্লেখ আছে।
পরে পলি জমে এবং এই নদী থেকে বের হওয়া দক্ষিণ বঙ্গের কুমার, ইছামতী, চূর্নি, নবগঙ্গা বের হয়ে পরে তা গঙ্গার সাথে মিশেছে।
সুন্দরবনে “করতোয়া নান্মি” নামক একটি ছোট নদী খরস্রোতা এখনো আছে ।
‘চণ্ডালরা’ পুণ্ড্র দেশের আদিম অধিবাসী বলে অনেকের অনুমান।
এই রাজ্যের অনার্য শাসকদের নাম তেমন পাওয়া না গেলেও “বালি” নামক শেষ অনার্য রাজাকে আক্রমণ করে আর্য রাজা । আর এক জায়গাতে উল্লেখ আছে পাণিনি কালে রাজা ছিলেন “পাউন্ড্রিক বাসু দেভা ” ।
খ্রিস্ট পূর্ব ৬০০ অব্দে অভির জাতি পুণ্ড্র রাজ্য আক্রমণ করে। পাহাড়পুরে বিরাট একটি কালি মন্দিরের ভগ্নাবশেষ পড়ে আছে। এটা ৬০০ বছর খ্রিস্টপূর্ব অভির দ্বারা তৈরি ।
অসুর গড়, (পুর্নিয়া) বেনুগড় (কৃষ্ণগঞ্জ ,পুর্নিয়া ), কান্তারনের প্রকাণ্ড বৌদ্ধ স্তূপ মনে করা হয় এগুলো অভির জাতি দ্বারা তৈরি ।
চীনা পর্যটক হোয়েন সাং এর বর্ণনায় পুণ্ড্রবর্ধনঃ 
চীনা পর্যটক হোয়েন সাং ৬২৯ খ্রিস্টাব্দে পুণ্ড্রবর্ধন আসেন। তার বিবরণে সেসময়ে গৌড় ,বঙ্গদেশ, চম্পা, কজুথির, পুণ্ড্র ষবর্ধন, সমতট , তাম্রলিপ্ত, কর্ণ সুবর্ণ , এই কটি রাজ্যের উল্লেখ আছে ।
পুণ্ড্র বর্ধন সম্বন্ধে তিনি বলেন ৪০০০ লিঃ অর্থাৎ ৬৬৬.৪ মাইল লম্বা । দুর্গের প্রাচীর ৪ মিটার প্রস্থ। রাজধানীতে জলাশয়, রাজার কার্যালয়, ফুলের বাগান, ২০ টি স্তূপ ,অশোক স্তূপ , ৩০০০ বৌদ্ধ শ্রমণের বাস, ১০০ হিন্দু মন্দির, অনেক জৈনের বাস, বৌদ্ধ স্তূপে স্বয়ং বুদ্ধদেব তিন মাস ধর্ম প্রচার করতেন।
এই ছিল পুণ্ড্র বর্ধন যা প্রাচীন বাংলার গর্ব । যা বাঙ্গালীর গর্ব । অনার্য বাঙ্গালীর গর্ব ।
চলবে
( বানান সংশোধিত )