Bunohash Banner

বঙ্গ আর বাঙ্গালি ,শেকড়ের খোঁজে , মাৎস্যান্যায় -এর যুগ

( ১৩ পর্ব ) বঙ্গ আর বাঙালি ,শেকড়ের খোঁজে, মাৎস্যান্যায়ণ-এর  যুগ

“মাৎস্যায়ন”-এর যুগ ১৩ 
বাংলার আকাশে দুর্যোগের ঘনঘটার একশত বছর:
পৃথিবীর ইতিহাসে নানা  জাতি গোষ্ঠীর  ভাগ্যে কোনো কোনো সময় নেমে আসে অন্ধকার। যেখানে উপযুক্ত শাসক এবং শাসনের অভাবে নিয়ম শৃঙ্খলা থাকে না। যার ফলে দেখা দায় দুর্বলের উপরে সবলের অত্যাচার ।
 কে কার ক্ষমতা কেড়ে  নেবে  তার ঠিক থাকে না। চারদিকে মারামারি আর অশান্তি লেগেই থাকে।
প্রাচীন বাংলার ইতিহাসে এরকম একটা সময় এসেছিল। যেখানে ক্ষমতার কাড়াকাড়ি লেগে গিয়েছিল।
সময়টা ছিল বাংলার প্রথম রাজা শশাঙ্কের মৃত্যুর পর।
সময় কাল:
বাংলার ইতিহাসকে চার  ভাগে  ভাগ করা হয়।
১) প্রাচীন যুগ ২) গুপ্ত  যুগ, ৩) মধ্য যুগ  ৪) আধুনিক যুগ
প্রাগৈতিহাসিক  যুগ থেকে মৌর্য কাল ।
গুপ্ত উত্তরকাল থেকে শশাঙ্ক ।
মধ্য যুগ হলো  তৃতীয় যুগ । যা কিনা বিশৃঙ্খলার যুগ থেকে পাল ও সেন যুগ পর্যন্ত ।
আধুনিক যুগ পলাশী যুদ্ধের পর থেকে আধুনিক যুগ ।
মাৎস্যায়ন যুগ হলো তৃতীয় ভাগের শুরুর দিকে।
৬৫০- ৭৫০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত এক শত বছর ।
সেসময় বাংলার অবস্থা:
আক্রমণ
রাজা শশাঙ্কের মৃত্যুর পর তার পুত্র “মানব দেব” ক্ষমতায় আসে। তিনি ছিলেন  দুর্বল রাজা। তার দুর্বলতার সুযোগে বাংলা বার বার বহিঃশত্রু দ্বারা আক্রান্ত  হয়।
শশাঙ্কের মৃত্যুর পরে  তার পুত্র মানব দেব মাত্র  এক বছর ক্ষমতায় ছিল। সে সাম্রাজ্য রক্ষা করতে পারে নি।
সেসময় হর্ষ বর্ধন ও তার মিত্র কামরূপ রাজ ভাস্কর বর্মা গৌড় অর্থাৎ বাংলা দখল করে।
হর্ষ বর্ধন ৬৪৭ খ্রিষ্টাব্দে মারা গেলে “জয়নাগ” নামে এক রাজা কিছুকাল শাসন করে। সেসময়ে অনিশ্চয়তা আর  দুঃশাসন আরও গভীরে যায়।জয়নাগের পরে আর  কোনো ক্ষমতাধর শাসক আসে নাই।
এই দুঃসময়ে তিব্বতীয় রাজা “ওয়াং হিউয়ান” এবং “সং সান গেম্পো” বার বার এ অঞ্চলে অভিযান চালায়।
কনৌযের রাজ যোশ বর্মণ বাংলা আক্রমণ করে তবে তাকে পরাজিত করে কাশ্মীরের রাজা ললিতাদিত্য।
এইসব উল্লেখ আছে “খালিম্পু তাম্র শাসনে”। কাশ্মীরি ঐতিহাসিক কলহনের রজত্রনি গ্রন্থে উল্লেখ আছে ললিতাদিত্য গৌড়ের পাঁচ জন রাজাকে পরাজিত করে হয়েছে। এথেকে বোঝা যায় এই অঞ্চল কত খণ্ড বিখন্ড ছিল।
ঐতিহাসিক তারানাথ (বৌদ্ধ ধর্ম গুরু ) লিখেছেন “ক্ষত্রিয় ব্রাহ্মণ, কায়স্থ সবাই নিজেদের ঘরে নিজেরাই রাজা ঘোষণা করে । শাসনের জন্য আর কোনো রাজা ছিল না” ।
এর পরে আরম্ভ হয়  অন্তবিদ্রোহ ও আরজকতা । সব কিছু ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় ।
মহা সামন্ত এবং সামন্তদের মধ্যে রাজা ঘোষণা করার প্রতিযোগিতা লেগে যায়।
ধনী ব্যাবসায়ী এমনকি প্রতিবেশী যে পারছিল সেই নিজেকে রাজা ঘোষণা করে।
যার ফলে একজন রাজা ঘোষণা করলে পরের দিন আর একজন তার মস্তক ছিন্ন করে ক্ষমতায় আসা একটা নিত্য নৈমিত্যিক ব্যাপার হয়ে পড়ে । দেখা যেত খণ্ডিত মস্তক ধুলায় গড়াগড়ি হতে।
“জোর যার মুল্লুক তার”  এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার ফলে কোথাও ন্যায় বিচার ছিল না। শক্তিধর মানুষ দুর্বল মানুষকে শোষণ আর নিপীড়ন করত ।
সামন্তরা নিজ নিজ এলাকায় স্বাধীনতা ঘোষণা করে। শিক্ষা,  উন্নয়ন স্তব্ধ হয়ে যায় ।
ব্যাবসা বাণিজ্যের হাল বেহাল হয়। গৌড়বাসী মাথার উপর থেকে অবিভাবক হারায়।
সেসময় হিউয়ান সাং (৬৩৮খ্রি. ) বাংলায় এসেছিল ।
তার বিবরণে জানা যায় একই  অঞ্চলে পাঁচটি রাজ্য ছিল। সব ঘোষণাকারী রাজ্য ।
বৌদ্ধগ্রন্থ “আর্যমঞ্জুশ্রীকল্পে” বিবরণ অনুযায়ী ক্ষুদ্র সামন্ত রাজাকে,  শক্তিশালী সামন্ত হত্যা করে ক্ষমতা নিয়ে নিত ।  যাকে বলে “মাৎস্যায়ন”-এর যুগ । অর্থাৎ মাছের রাজ্যে যেমন ছোট মাছকে  বড় মাছ খায় বিষয়টা সেরকম।
দীর্ঘ রাজনৈতিক গোলযোগ ও রাজনৈতিক শূন্যতার সুযোগে চারদিকে বিশৃঙ্খলা শুরু হয় ।সময়ের প্রয়োজনে একটা পরিবর্তন জরুরীভাবে দরকার হয়ে পড়ে ।
সেসময়ে গোপালের আবির্ভাব হয়। তার পিতার নাম ব্যাপট ,পিতামহের  নাম দয়িত বিষ্ণু ।
কেউ বলে জনগণ তাকে নির্বাচন করেছে । “খলিম্পুর” তাম্রশাসন অনুযায়ী “প্রকৃত পুঞ্জ” কতৃক নির্বাচিত হন। “প্রকৃত পুঞ্জ” অর্থাৎ নেতৃস্বানীয় ব্যক্তি বা গোপালের অনুগামী ।
মাৎস্যায়ানের সমাপ্তি ও পাল বংশের প্রতিষ্ঠা।
গোপালের হাত ধরে শুরু হয় পাল বংশের। এই বংশ বাঙালি। এই আমলেই পুণ্ড্রবর্ধন উন্নতির চরম শিখরে ওঠে।
(বানান সংশোধিত )
চলবে