জীবন ও মনস্তত্ত্ব: সৌন্দর্য।। নীলকণ্ঠ জয়
‘আমার পুরুষ অথবা আমার নারী সুন্দর নয়!’ এই অদ্ভুত অভিযোগ করেন অধিকাংশ নারী অথবা পুরুষ! সৌন্দর্য বলতে এক্ষেত্রে বুঝানো হয়েছে বলিষ্ঠ/ রূপবান/ সর্বাঙ্গে রূপবতী। ক্ষুদ্রার্থে এই শব্দার্থ ব্যবহার করতে পছন্দ করেন সমাজের বৃহত্তর অংশ৷ কিন্তু সৌন্দর্যের ব্যপকতা কী এতটাই ক্ষুদ্র? আসুন একটি আত্মজীবনীর গল্পাংশ দিয়ে শুরু করি। তার আগে কয়েকটি প্রশ্ন, ‘ভালোবাসা কি সৌন্দর্যেরও উর্ধ্বে?’ অথবা ‘সৌন্দর্য কি ভালোবাসার উর্ধ্বে?’ ‘প্রেম কি মোহের উর্ধ্বে?’ ‘প্রেম আর প্রত্যাশা কি সাংঘর্ষিক?’ বিশ্বাস রাখি এই আলোচনার শেষে সবগুলো উত্তর পেয়ে যাবেন।
কথায় আছে, ‘ভালো লাগা আর ভালোবাসা এক নয়।’ এই কথাটিকে ভিন্নভাবে বলতে ভালোবাসি আমি। ‘ভালো লাগা আর ভালোবাসা দুইটি বিষয় মিলেই প্রেম। এখানে সৌন্দর্যের সাথে ভালো লাগার সম্পর্ক মিশে আছে। এই সৌন্দর্য হৃদয়ের গভীর থেকে আসা কোনো না কোনো সম্মান থেকে সৃষ্ট অথবা কোনো না কোনো বিষয়ে মুগ্ধতা। অথবা চরম মোহময়তা!!’ মনে করুন আপনার স্ত্রী অসুন্দর, কিন্তু তার সৃষ্টিশীলতা আপনাকে মুগ্ধ করে! আর আপনি যদি সেই সৃষ্টিশীলতার প্রেমে পড়ে থাকেন, তবে নিশ্চিতভাবে জেনে রাখুন আপনি আপনার রমণীর প্রেমেও পড়েছেন। অথবা কারো হাসি, কারো চোখ কিংবা কারো সফলতা আপনাকে তার প্রতি দুর্বল করতে পারে। কিন্তু একত্রে একজন মানুষ সর্ববিষয়ে সফল কিংবা নিরেট সুন্দর নয়।
‘কালো, তা সে যতই কালো হোক, দেখেছি তার কালো হরিণ চোখ!’ রবিঠাকুরের এই লাইনদুটি একইসাথে মোহ, একইসাথে প্রেম। প্রেম থাকলে মোহ থাকবে না, বিশ্বাস হয় না।
এই সমাজে একজন মানুষ কখনোই শতভাগ পরিপূর্ণ নয়, তার দুর্বলতাগুলো খাটো করার বদলে তাকে উৎসাহ দিয়ে পরিপূর্ণ করার প্রচেষ্টা করাই উচিৎ। অথচ আমাদের সমাজে অপরিপক্ব এবং অপরিপূর্ণ মানুষকে অবহেলা করতে করতে একদিন অথর্ব বানিয়ে ফেলা হয়। আমাদের সামাজিক নানা প্রতিবন্ধকতা আর মানসিক দুর্বলতা আমাদের ধীরেধীরে কিছু বিষয় নিয়ে দোটানায় ফেলে, সমস্যা তখনই ঘটে। যখন প্রেম আর ভালোবাসার সাথে ‘প্রত্যাশা’ শব্দটি যুক্ত হয়, সমস্যা তখনই সৃষ্টি হয়; তখনই ‘অপূর্ণতা’ নামক শব্দটি ভিলেন হয়ে দাঁড়ায়। যেমন-
‘অমুকের বউ ভালো নাচে, তুমি একটা অকম্মা!’
‘অমুকের বরের বাড়ি-গাড়ি আছে; তুমি কী করলা!’
‘অমুকের বউ সিনেমার হিরোইনের মতোন, তুমি ক্ষ্যাত!’
‘অমুকের বর বিরাট নেতা, তুমি একটা যাচ্ছেতাই…!’ ইত্যাদি।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়কার কথা। কার্ল ট্যাঞ্জলার নামে একজন বিখ্যাত ডাক্তার ছিলেন। তিনি যক্ষা রোগ বিশেষজ্ঞ বলেও খ্যাত ছিলেন। ইংল্যান্ড, ভারত, অস্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যক্ষা নিরাময়ে তিনি বিরাট ভূমিকা রেখেছিলেন। ততকালীন রাজ পরিবার তাকে কাউন্ট উপাধিতে ভূষিত করেন। তিনি চিকিৎসক হিসেবে এতোটাই আত্মবিশ্বাসী ছিলেন যে, তিনি ঈর্ষায় অথবা দম্ভে নিজের নামের আগে কাউন্ট শব্দ ছাড়া সম্বোধন খুব অপছন্দ করতেন। ইউরোপীয় কালচারে কালো চুলের মেয়ে পাওয়া দায়, কিন্তু কার্ল ছোটবেলা থেকে স্বপ্ন দেখতেন তিনি একজন কালো চুলের মেয়ের প্রেমে পড়বেন।
এই গল্পের অন্য একটি চরিত্র মারিয়া এলেনা মিলাগ্রো। অনিন্দ্য সুন্দরী মেয়েটি ১৬ বছর বয়সে লুই মেসা নামে এক ব্যক্তির সাথে বিয়ে হয়। তার গর্ভের সন্তান এলে জোরপূর্বক গর্ভপাত করানো হয় সৌন্দর্যের যাতে ঘাটতি না পড়ে। এতে মারিয়া অত্যন্ত অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং ধীরেধীরে তার সৌন্দর্যে মলিনতার ছাপ পড়তে থাকে৷ লুই তাকে ছেড়ে চলে যায়। সেই সময় আমেরিকায় প্রতিদিন লক্ষাধিক মানুষ যক্ষ্মায় মারা যেতো। ২১ বছর বয়সে মারিয়া যক্ষ্মায় আক্রান্ত হলে পরিবারের সদস্যরা তাকে খরচের খাতায় ফেলে দেয়৷ কিন্তু ডাক্তার কার্ল তার স্বপ্নের কালো চুলের একজন মেয়ে পেয়ে যান এবং তিনি হাল না ছেড়ে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যান মারিয়াকে বাঁচাতে। তিনি নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন কালো চুলের মেয়েটিকে তিনি মনের কথা বলতে পারছেন!
কিন্তু যক্ষার কাছে হার মেনে মারিয়া একদিন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কার্ল তাকে একটি সৌধ বানিয়ে মারিয়ার কফিনটি সেখানে দেন। আর সৌধে গিয়ে প্রতিরাতে কফিনের মুখ খুলে ফরমালিন দিয়ে আসতেন মারিয়া যাতে পঁচে না যায়। তার প্রেম এতটাই মর্মস্পর্শী ছিলো যে, এই লাশের সাথে নয় বছর একাকী গল্প করে কাটিয়েছেন তিনি। তিনি বিশ্বাস করতেন, একদিন মারিয়াকে তিনি তার মনের কথা বলতে পারবেন।
কার্ল ট্যাঞ্জলার একটি মর্মস্পর্শী আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথাও লিখেছেন, যার একটি উল্লেখ্যযোগ্য অংশজুড়ে আছে স্বপ্নকন্যা মারিয়া এলেনা।
তিনি লিখেছেন, ‘এলেনা, প্রিয়তমা আমার, সমুদ্রতীরে আমরা নিঃসঙ্গ দুজন। যিনি তোমাকে আমার হাতে তুলে দিয়েছেন, আমাদের আত্মাকে তিনি একত্রে গেঁথে রাখবেন।’
ডায়েরিতে তিনি মৃত মারিয়াকে চুম্বন ও আলিঙ্গন করার কথাও লিখেছেন! ‘মানুষের ঈর্ষপরায়ণতা আমার এলেনার দেহ আমার কাছ থেকে সরিয়ে নিয়েছে, তবুও স্বর্গীয় প্রশান্তি আমার মধ্যে প্রবাহিত হয়! সে মৃত্যুকে অতিক্রম করেছে, চিরদিন সে আমার সাথেই আছে।’
প্রেমের কারণে ভাল লাগার অনুভূতি খুব দ্রুত প্রসার লাভ করে। ভুটানের একটি সিনেমা দেখেছিলাম। নাম ‘লুনানা-আ ইয়ক ইন দ্য ক্লাসরুম’। গল্প ভিন্নমাত্রার কিন্তু অপ্রাসঙ্গিক নয়। একটি দুর্গম এলাকায় শিক্ষক হিসেবে চাকুরি করতে এসেছিলো ইউগেন নামে এক যুবক। তার স্বপ্ন ছিলো সে একদিন অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে বড় গায়ক হবে। তাই এই শিক্ষকতা পেশা তার ভালো লাগেনি। তবুও রাষ্ট্রের শর্ত মেনে সে লুনানা গ্রামে শিক্ষকতা করতে চলে যায়। সেখানকার বাচ্চারা, গ্রামের মানুষজন তাকে ঈশ্বরের মতো শ্রদ্ধা আর সম্মান করতো। ধীরেধীরে ইউগেন সেই পেশাকে আপন করে নেয়। একদিন তার হাতে অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার অফার লেটার পাশ হয়ে আসে। ইউগেন নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য এতো এতো ভালোবাসা উপেক্ষা করে অস্ট্রেলিয়ার একটি বারে গায়ক হিসেবে যোগ দেয়। মদ্যপ মানুষজন ইউগেনকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে। তখন সে বুঝতে পারে সে যে ভালোবাসাকে উপেক্ষা করে এসেছে, তা ছিলো চীর অমূল্য। লুনানা গ্রামটি ছিলো দুর্গম এবং বসবাস অযোগ্য, কিন্তু সেই গ্রামে ভালোবাসা ছিলো অফুরান।
মানুষের চাওয়া পাওয়ার অমিলে প্রেম অনেক সময় উপেক্ষায় পরিনত হয়, আর সেই উপেক্ষা একদিন আফসোসে পরিনত হয়।
আরেকটি গল্প আমাদের অনেকেরই জানা। ভাইরাল একটি কাহিনী। কিছু মানুষের জীবনে সত্যিকারের প্রেম আসে। যে প্রেম সব বিপত্তি উপেক্ষা করে চীর অমর হয়ে যায়। এই সম্পর্কে সঙ্গীর চেহারা কোনো প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়ায় না। বরং ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবে তারা। ভারতে এসিডদগ্ধ ললিতা বেন বানসি আর রবি শংকরের কথা বলছি। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো ললিতা তাকে খুঁজে পেয়েছেন ফোনের রং নম্বরে। রং নম্বরে ফোন আসার পর পরিচয় ঘটে তাদের। তারপর এক সময় সেটি প্রেম বিয়েতে গড়ায়। শুরুতেই বলেছিলাম, প্রেমিক বা প্রেমিকার কোনো না কোনো একটি বিষয় প্রেমের জন্য মুখ্য হয়ে ওঠে। সত্যিকারের প্রেম বাহ্যিক সৌন্দর্যের উর্ধ্বে গিয়ে অন্য কোনো বিষয়ের লেনাদেনা করে। ওভার ফোনে ললিতার সুললিত কণ্ঠ আর যত্নশীল আচরণ রবি শংকরকে চুম্বকের মতো আকর্ষণ করতো, আর তাইতো ললিতার সাথে প্রথমবার দেখা হওয়ার পরও এসিডদগ্ধ মুখ দেখেও দ্বিতীয়বার ভাবেনি। সম্ভবত পৃথিবীর অন্যতম সেরা জুটি তারা। সিসিটিভি কোম্পানির বড় পদে চাকুরি করা রবি, ধুমধাম করে বিয়ে করে নেয় ললিতাকে।
উপরের গল্পগুলো অপ্রয়োজনে লেখা নয়৷ গল্পগুলো আমাদের কিছু বার্তা দেয়, যা আমাদের দীনতা গুলোকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। সারাংশ করলে দাঁড়ায়-
*ভালোবাসাকে প্রত্যাশা দিয়ে পরিমাপ করা, *ভালোবাসাকে অসম্মান কিংবা অস্বীকার করা এবং *ভালোবাসাকে স্বার্থের প্রয়োজনে দূরে ঠেলে দেওয়া কখনোই ভালোবাসা নয়।
উত্থান পতনের ভীড়ে ভালোবাসা টিকিয়ে রাখতে পারেন একমাত্র বুদ্ধিমান মানুষগুলো। প্রেমের কথা বাদই দিলাম, এই সমাজে খুব কম মানুষই পারেন সমাজবদ্ধ হয়ে ভালোবাসা আদান প্রদান করতে। দুঃসময়ে আমরা ক’জনা হাত হাত রেখে আলোর সন্ধান করতে জানি?
”It is during our darkest moments that we must focus to see the light.” – Aristotle
‘প্রত্যাশা’, ‘উপেক্ষা’ আর ‘অবহেলা’ শব্দ তিনটিকে ‘প্রেম’ আর ‘ভালোবাসা’র সাথে মিল-অমিল করে দেখুন। দেখবেন, একটি গেম খেলছেন! আর বাস্তব জীবনে আমরা এই শব্দগুলোর অপব্যবহারে গেম খেলেই যাই।
এবার বলুনতো?
‘ভালোবাসা কি সৌন্দর্যেরও উর্ধ্বে?’ অথবা ‘সৌন্দর্য কি ভালোবাসার উর্ধ্বে?’ ‘প্রেম কি মোহের উর্ধ্বে?’ ‘প্রেম আর প্রত্যাশা কি সাংঘর্ষিক?’
‘মানুষ থেকেই মানুষ আসে
বিরুদ্ধতার ভিড় বাড়ায়
আমরা মানুষ, তোমরা মানুষ
তফাৎ শুধু শিরদাঁড়ায়…..!!’












