পৃথিবীর পথে পথে: সালভার্ড (Salvard)।। হুসনুন নাহার নার্গিস
১৯ জুন ২০২৪, বুধবার
সময়টা ডিসেম্বর, ২০২০। উত্তর গোলার্ধের একটি দ্বীপ নিয়ে আজকের এই ভ্রমণ কাহিনী। স্মৃতির পাতা থেকে লিখতে বসলাম সেই ভ্রমণকাহিনী।
“থাকবো না আর বদ্ধ ঘরে দেখবো এবার জগৎ টাকে”
🥽 শ্বেত ভল্লুক!
🥽 রেইন ডিয়ার!
🥽 ছয় মাস ‘দিন’ বলে কিছু নেই, আছে শুধু রাত, আছে শুধু অন্ধকার!
🥽 বাকি ছয় মাস শুধুই দিন, ’রাত’ বলে কিছু নেই!
কোথায় বলুনতো?
উত্তর গোলার্ধের খুব কাছের একটা দ্বীপ। হ্যাঁ, নাম তার ‘সালভার্ড’। শুরুতে সালভার্ডের কথাই বলছিলাম। যেখানে এই অদ্ভুত ব্যাপারগুলো বিরাজমান, যা পৃথিবীর অন্যকোনো প্রান্তে গিয়ে দেখা সম্ভব নয়।
🔆 কেন এই অদ্ভুত দিন আর রাতের খেলা?
কারণ, পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধ যখন সুর্য থেকে উত্তর মেরুটি কাত করে সরে যায়, নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত তখন সূর্যের আলো আর পায়না। ছয়মাস এভাবেই অন্ধকার হয়ে থাকে। তারপর উত্তর মেরু আবার ঘুরে যায় সূর্যের দিকে। তখন দীর্ঘদিন শুধুই দিনের আলো। সূর্যের চারদিকে পৃথিবীর চলার পথটিকে বলা হয় কক্ষপথ। এই কক্ষপথে পৃথিবী বাকি ছয়মাস সূর্যের দিকে উত্তর মেরুটি মুখ করে থাকে। তাই বাকি ছয় মাস সূর্যের আলো থাকে ২৪ ঘণ্টা জুড়ে। এই হল আমাদের পৃথিবী আর সূর্যের খেলা। এটি প্রাকৃতিক নিয়মেই হয়ে থাকে।
🔆 কেমন ছিল এই দ্বীপ?
এই দ্বীপে একসময় কোন মানুষ ছিলনা। গাছপালা তো দূরের কথা ঘাসও ছিল না। সুপেয় পানিও নেই। হ্যাঁ, এখন কিছু মানুষ বাস করেন শুধুমাত্র ট্যুরিজম ব্যবসার জন্য। ইদানীং একটা ছোটো খাটো এয়ারপোর্ট করা হয়েছে ,ইলেকট্রিসিটিও গেছে। করা হয়েছে রিসোর্ট। মানুষ আসে শুধু এই এর জিওলজী আর জ্যু’লজি বুঝতে, জিয়োগ্রাফী দেখতে। আবার কেউ কেউ আসেন স্নো স্পোর্টস করতে। কেউবা আসেন ক্রুজ করে শ্বেত ভাল্লুক দেখতে।
🔆 আমাদের ভ্রমণ কাহিনী:
আমাদের পরিবার তথা আমাদের টিম রওনা দিলাম ট্যুরিস্ট হিসেবে সালভার্ড অ্যাডভেঞ্চারে। নরওয়ে থেকে শুরু হলো প্লেনে যাত্রা। সময়টা ডিসেম্বর, ২০২০। সালভার্দ এয়ারপোর্ট হাজারবার বরফ পরিষ্কার করা হলেও সঙ্গে সঙ্গে আবার আইস হয়ে যায়। তাই প্লেনটা নেমেই একটু স্লিপ করলো। আমরা নেমে পড়লাম প্লেন থেকে। যাই হোক, চেকিং সম্পন্ন করার পর বাইরে এসে দেখি সেখানে রাখা আছে বিরাট একটি শ্বেত ভলুকের রেপ্লিকা। হোটেলে নিয়ে যাওয়ার জন্য সব সময় বাস থাকে এয়ারপোর্টের বাইরে। সে সময় ২৪ ঘন্টা অন্ধকারের সময়। চারদিক দুই হাঁটু সমান নরম বরফ!
রিসোর্টে এসে দেখলাম ভিতরটা খুব সুন্দর এবং বেশ গরম। রিসোর্টের মালিক আমাদের জন্য বিরাট একটি কেক বানিয়ে টেবিলের উপরে রেখে দিয়েছিলেন। এটিকে বলা হয় ওয়েলকাম কেক। রাতের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। ঘড়িতে এলার্ম দিয়ে সকাল করা হল বটে কিন্তু সকালেও রাত, দুপুরেও রাত, বিকালেও রাত! ওই যে বলেছিলাম, এখানে ছয় মাস রাত থাকে।
🔆 কুকুরে টানা স্লেজ গাড়ি:
আমরা অন্ধকারে বুকিং দেয়া স্লেজ গাড়িতে অ্যাডভেঞ্চার করার জন্য রেডি হলাম। গাড়ি এসে নিয়ে গেলো আমাদেরকে। দূর থেকে কুকুরের ডাকাডাকি শোনা যাচ্ছিল। শুনলাম তারা নাকি স্লেজ নিয়ে দৌড়াতেই পছন্দ করে। প্রায় ১০/১২টি কুকুর টেনে নিয়ে যাচ্ছে আমাদের গাড়ি। দুই একটা বাড়ি শেষ হলেই সব ফাঁকা। শুধু বরফ আর বরফ। পাশেই সমুদ্র, আবছা আলোয় দেখা যাচ্ছে সাদা সাদা বরফ ভেসে বেড়াচ্ছে সমুদ্রে। কনকনে ঠাণ্ডায় সবকিছু জনে আছে। উত্তর মেরুর ঠাণ্ডা কনকনে বাতাসের বর্ণনা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। হাত বের করে ছবি তুলবো কিন্তু হাত বের করতেই পারছিলাম না। যদিও ডবল করে গ্লভস পরে ছিলাম। তাপমাত্রা কম করে হলেও মাইনাস ৪০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড হবে।
আমাদের গাইড তার কোমরের বেল্টে ৪/৫ টি রিভালভার নিয়ে রেডি করে রেখেছেন। শ্বেত ভাল্লুক কয়েক মিটার দূর থেকে আক্রমণ করতে পারে। তখন আমাদেরকে বাঁচাতে গাইডকে ভাল্লুক মেরে ফেলার বিকল্প কিছু নেই। সালভার্ডে মানুষের চেয়ে শ্বেত ভালুকের সংখ্যা বেশি। গাইড জানালো কিছুদিন আগে এরকম একটা ঘটনা হয়েছিলো ঠিক এই যায়গাতেই। ভয়ে গা ছমছম করে উঠলো।
গাইডকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তুমি কি শ্বেত ভল্লুক দেখেছ?’ সে মাথা নেড়ে জানালো, অনেকবার দেখেছে। তার যেহেতু টুরিস্টদেরকে এখানে আনা নেওয়ার কাজ, তাই অনেকবার দেখেছে সে। যেহেতু ভাল্লুকের ঘ্রাণশক্তি এতোটাই বেশি, অনেক দূর থেকেও ঘ্রাণ পেয়ে যায় কোন দিকে শিকার আছে।একেতো তীব্র শীত, তার উপর আবার শ্বেত ভাল্লুকের ভয় আর চারদিকে নিকষকালো অন্ধকার। নিরাপত্তার কথা ভেবে রিসোর্টের দিকে রওনা দিলাম।
যেতে যেতে আমাদের গাইড সালভার্দের অনেক গল্প করলো। সালভার্দের আয়তন ৬২,১৬০ বর্গ.কি.মি.। প্রায় আয়ারল্যান্ডের সমান। উত্তর গোলার্ধের ৮১ ডিগ্রি উত্তরে আর্টিক সমুদ্রের মধ্যে অবস্থিত এই দ্বীপটি। ১১৯৪ সালের আগে মানুষ জানতো না এই দ্বীপের কথা। ১১৯৪ সালের পরে মানুষ জানতে পারে এখানে একটা দ্বীপ আছে কিন্তু জানতো না যে, এটা একটা দ্বীপ না আইসবার্গ । আইসবার্গ মানে ভাসমান বিরাট আইস।
এরপরে আরও কয়েকশত বছর পরে চীন আর ইন্ডিয়া যাওয়ার শর্টকার্ট রাস্তা খুঁজতে ডেনমার্কের একটি জাহাজ নরওয়ের চারদিকে ঘুরাফেরা করছিল। সময়টা ১৫৯৬ সাল। সেই জাহাজে থাকা ‘উইলিয়াম ব্যারেন্ট’ নামক একজন নাবিক এই দ্বীপে নামেন এবং অফিসিয়ালি তাকেই বলা যায় এই দ্বীপটির আবিষ্কারক। তিনি খুব ইমপ্রেসড হন এর ক্যারেক্টার আর পাহাড়ি ল্যান্ডস্কেপ দেখে এবং নাম দেন “Spits bergen”।
এখানকার সমুদ্রে তিমি আছে। দ্বীপে আছে শ্বেত ভাল্লুক, সাদা শেয়াল, রেইন ডিয়ার আর সী ঈগল ।এখানকার আইস ৬০০ মিটার পর্যন্ত গভীর। চতুর্দিকের পাহাড় থেকে নেমে এসেছে ২,১০০ গ্লেসিয়ার। এখানে এখনো বরফ যুগ চলছে।
মজার ব্যাপার হলো সালভার্দে কেউ জন্ম গ্রহণ করে না। কেউ প্রেগন্যান্ট হলে বাচ্চা হতে নরওয়ে চলে যায়। সালভার্দে মৃতদেহ সমাহিত করা হয় না ,কারণ মৃতদেহে পঁচন ধরে না। ডেড বডি বা লাশ নরওয়ে নিয়ে গিয়ে দাফন করা হয়। একটা রাত এখানে তিন থেকে চার মাস দীর্ঘ আর একটা দিন দীর্ঘ তিন থেকে পাঁচ মাস দীর্ঘ । এখানে প্রায় তিন হাজার শ্বেত ভল্লুক আছে। মানুষের চেয়ে বেশি ।
চারদিকে একটু ঘুরাঘুরি করলাম আমরা। আর পরের দিন সকালেই ফিরে আসলাম নরওয়ে। এমন অদ্ভুত এক ল্যান্ডস্কেপ দেখে ভাবছিলাম এই পৃথিবী কতই না বিচিত্র।















