প্রত্যাখ্যান।। তাসনিয়া তানহা
আমার জন্মদিন ছিল সেদিন। ম্যাসেঞ্জারে বা ইমোতে দু একবার কথা হয়েছে রিজুর সাথে। বুঝে গিয়েছিলাম সে আমাকে ফিল করে। ঠিক করলাম আমরা কথা বলব সামনাসামনি। অবশ্য আমাদের পরিচয় শুধু অনলাইনে নয়। যোগাযোগটা শুরু হয়েছিল ম্যাসেঞ্জারে দু একটা ম্যাসেজ বিনিময়ের মাধ্যমে।
আমার কাজিন রুমার দেবর সে। রুমার বিয়েতে প্রথম একবার দেখেছিলাম। পরে রুমার বাসায় আরো দু একবার দেখা হয়েছিল। সেভাবে কোনো কথা হয়নি কখনো। রিজু ভীষণ লাজুক আর ইন্ট্রোভার্ট। আর আমি তো কোনো দিন কোনো ছেলেদের সাথে মেশার সুযোগই পাইনি। আমার রক্ষনশীল পরিবার কট্টোরপন্থী। সরকারি বালিকা বিদ্যালয় আর মহিলা কলেজে ভর্তি করিয়েই বাবা নিশ্চিত হন নি। মাঝে মাঝে তিনি কলেজের গেট থেকে মেয়েকে নিয়ে আসতেন পর্যন্ত। এই জীবন এতটাই ছেলে সংগবর্জিত ছিল যে কারো সাথে কথা বলাও আমার জন্য একেবারে গর্হিত অপরাধ হিসেবে গন্য হতো আমার পরিবারে।সেই আমি রিজুর প্রেমে পড়ি। প্রেম না বন্ধুত্ব বুঝিনি আজও।
রিজু ভীষণ ভালো একটা ছেলে তখন সবাই তার প্রশংসা করতো।আমিও দু একজনের কাছে তার গল্প শুনে শুনে প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম। সে তখন চারুকলায় পড়তো৷ একজন নিভৃত শিল্পীর মতো সারা বাড়িতে তার স্কেচ। কোনো কথা নেই চুপচাপ বাড়িতে এলে কাজ করতো নিজ ঘরে।
খুব লোভ হতো তার শিল্পকর্ম দেখার। রুমার বাসায় যেতাম যখনই রিজু চারুকলা থেকে ছুটিতে বাড়ি ফিরেছে শুনতাম । উদ্দেশ্য শুধু রিজুর সাথে দেখা করা। কিন্ত রিজু বুঝতে পারতো না। অথবা মুখ তুলে চাইতো না।
এভাবেই কেটে গেলো অনেক বছর। আমিও ব্যস্ত ছিলাম আমার জীবনের নানা টানাপোড়েন আর উত্থান-পতনের আবর্তে ।
পরিচয়ের ৬ বছর পর গতকাল আমাদের দেখা হলো।
আমাদের বিশেষ কোনো কথা ছিল না মুখে। সাধারণ কিছু গল্প। তার চাকুরী কেমন চলছে, আমার দিনকাল ইত্যাদি। আমার খুব বলতে ইচ্ছে করেছিল অনেক প্রশ্ন। তার বিয়েটা কেন তিন মাসও টিকলো না। কিন্ত মায়া হলো বড্ড। জানা হলো না। আমিও যে ইতিমধ্যে শর্ট ডিভোর্স। মনে হলো রিজুই বুঝবে আমার একাকীত্ব।
বন্ধুত্বের গাঢ়তা বাড়তে থাকলো। আমি কিছুটা অসুস্থ ছিলাম মানসিক চাপে। তাকে সত্যিই আমার খুব প্রয়োজন ছিলো পাশে। ছুটে যেতাম চারুকলা কিংবা সংসদ ভবন, চন্দ্রিমায়। হাত ধরে বসে থাকতাম ছুটির দিনগুলো। একদিন রিজু আমাকে ওর বাসায় যেতে বলল। আমিও মন্ত্রমুগ্ধের মতো ছুটে গেছি ওর জন্য। তারপর যা হলো তা নিজেকে সামলে না নেয়ার ইতিহাস। অসচেতনভাবে আমি কনসিভ করে বসলাম। রিজু ভীষণ ব্যস্ত তখন নতুন চাকুরী নিয়ে। আমি বিয়ের কথা বললামসে রাজী হলো না। কিংবা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আমাকে
অন্য কিছু বোঝাতে চাইলো। আমি আবারো ভেংগে পড়লাম। এই জীবনের গল্পটা শেষ করে দিতে ঝাপিয়ে পড়ে ছিলাম আত্মহননের পথে।
শেষ পর্যন্ত পারিনি। আমার অন্ধকার বীজটি বহন করতে অন্ধকার এক পথ পাড়ি দিতে শুরু করলাম। আমাকে সেই মুহুর্তে স্বীকৃতি দিলো রায়হান। আমার সন্তান পেলো তার পিতৃ পরিচয়। রিজু আমি কোনও দিন আমার সন্তানের মুখোমুখি
তোমায় হতে দেব না।রায়হান জন্মদাতা না হয়েও আমার সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য সব কিছু করে যাচ্ছে। আমি তোমাকে কোনো দিন ক্ষমা করব না রিজু। এক জীবনের সবচেয়ে বিশ্বাসের জায়গাটুকু দিয়েছিলাম যাকে সে অবিশ্বাসের সাথে জীবনটাকে থমকে দিলো আমার ভেতরে ঘৃনা ছাড়া আর কিছু রইলো না ভালোবাসা নিয়ে।
এখন আমার সব বিশ্বাস আর ভালোবাসা রায়হানকে নিয়ে।এ সুখটুকু আমার জীবন বদলে দিয়েছে।আমি নতুন করে নিজেকে চিনেছি।ভুলগুলো আমাকে আর দুমড়ে মুচড়ে দিতে পারবে না। আমার সন্তান এখন বড় হচ্ছে।যদি কখনো রিজুর সাথে দেখা হয় আমি জিজ্ঞেস করবো নিজ অস্তিত্বকে কি করে মানুষ অস্বীকার করে? রিজুরা সত্যিই কেন অবিশ্বাসের সাথে ভালোবাসার প্রত্যাখ্যান অর্থ বদলে দেয়।













