একটি ছায়ামূর্তি।। জিনাত খানম শিলা
সাংবাদিকতা পেশায় প্রবেশ করেছি খুব বেশী দিন হয়নি , চমকপ্রদ তথ্য সংগ্রহের জন্য সবার কাছে মোটামুটি আমি পরিচিত মুখ…
কিছু সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত থাকার সৌভাগ্য আমার হয়েছে, সেই সুবাদে আজকে আমার এই যাত্রা , কোলকাতার টালিগঞ্জের ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে আমি আমন্ত্রিত হয়েছি, যশোরের সীমান্তবর্তী এলাকার বেনাপোল ষ্টিশনে আমি আর আমার বন্ধু অঞ্জন অপেক্ষা করছি, ট্রেন আসতে তখনো কিছু টা সময় বাকি, আমার বন্ধু একটু শান্ত ও গোবেচারা প্রকৃতির, তাছাড়া একটু ঘুমকাতুরে, ও ষ্টেশনে বসে ঝিমুচ্ছে, আমি তো অত শান্ত প্রকৃতির নই আমি এদিক ওদিক পায়চারি করছি, যদিও তখন আকাশ ছোঁয়া কালো মেঘ দিনের সূর্যের আলো কে আড়াল করে রেখেছে, চারিদিকে মোটামুটি অন্ধকার, কেমন যেন গা ছমছম করা অনুভূতি হচ্ছিল, তবু ও মনটাকে সেদিকে যেতে দিলাম না।
তখন কৃষ্ণপক্ষ চলছে, ঘুটঘুটে অন্ধকার , অমাবস্যা তিথি সূর্য আর চাঁদ একে অপরের থেকে অনেক দূরে , তাই চাঁদ নিজেকে অন্ধকারে নিমজ্জিত করে রাখে পৃথিবীতে তখন চলে অমাবস্যা….,, এই ষ্টেশন টি অতটা আধুনিক নয়, পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা নেই , চারিদিকে বেশ ঘন গাছগাছলী , ঝোপঝাড়, মাঝে মাঝে দু-একটি জোনাকির দেখা পেলাম, ওরা হয়তো
আমাকে নতুন দেখে ওদের অস্তিত্বের জানান দিচ্ছিল।
স্টেশন মাষ্টার পরম নিশ্চিন্তে , চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুমোচ্ছে! নিজেকে প্রবোদ দিলাম,যাক বাবা উনি ঘুমোচ্ছে তো ঘুমাক আমার সেদিকে নজর দেওয়ার দরকার নেই! আমি সিগারেট টানছি আর পায়চারি করছি, হঠাৎ করেই কেমন যেন চৌম্বকীয় আকর্ষণ অনুভব করলাম, আমার দৃষ্টি বার বার অন্ধকার ঝোপের দিকে, আমি একপা,দুপা করে ঝোপের ঠিক কাছাকাছি চলে এসেছি, আমার চোখ হঠাৎ করেই আটকে গেল এক ছায়ামূর্তি কে দেখে , আমি সাতপাঁচ কিছু ই ভাবতে পারছি না , আমি যেনো এক অপ্সরার দেখা পেলাম,কি অপরূপ মায়াবী চোখ,
দীঘলকালো চুল , আমি তাঁর মায়াবী চোখের চাহনি তে বিহ্বল হয়ে গেলাম আমার সমস্ত অস্তিত্ব জুড়ে এক শিহরণ জাগালো ,আমি আমাকে ভুলে গেলাম , আমি মেয়েটির সৌন্দর্যে এতোটাই আকৃষ্ট হলাম , আমি আমার অতীত বর্তমান সব ভুলে গেলাম, কেমন যেন ওকে পাওয়ার নেশায় আমি উন্মাদ হলাম , আমি যত ই ওকে ছুঁতে চাই , কিন্তু আমি স্পর্শ করতে পারিনা , মেয়েটির আসক্তি আমাকে এতো টাই পাগল করে তুল্লো আমার বোধশক্তি লোপ পেলো , ওকে পাওয়ার নেশায় আমি তখন বদ্ধ উন্মাদ! কি মোহনীয় দৃষ্টি ,ছায়ামুর্তিটি এগুচ্ছে আমি ও তার সাথে সাথে এগুচ্ছি ,,কখন যে ঝোপ ঝাড় পেরিয়ে কপোতাক্ষ নদীর তীরে চলে এলাম তার কিছুই মনে নেই
একটি নৌকোয় আমরা তখন দু’জন, নৌকোটি তীর ঘেঁষে ঘেঁষে এগিয়ে চলছে, মনে পড়ে গেল আমার মধূসুদন দত্তকে, উনি তো জন্মেছে এই যশোরে , উনি কপোতাক্ষ নদী কে নিয়ে লেখেছেন অনেক লেখা!
বৈঠা বিহীন নৌকা টি হেলে দুলে চলছে, কতটা সময় এভাবে অতিবাহিত হলো আমি ঠিক জানি না , হঠাৎ করেই কেমন যেন আমার মোহভঙ্গ হলো, আমি নিজের মাঝে নিজে ফিরে এলাম , আমাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে অনেক লোক, আমি কিছু বুঝে উঠতে পারছিলাম না, আমার সাথে আসা বন্ধুটিকে দেখে কিছু টা আশ্বস্ত হলাম , আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে ওর দিকে তাকিয়ে আছি , ও চোখের ইশারায় আমাকে আশ্বস্ত করলো ,বললো চলো তাড়াতাড়ি এখনি ট্রেন চলে আসবে, আমি অঞ্জন কে জিজ্ঞেস করলাম কি ব্যাপার আমি নদীর তীরে কি করে এলাম, জানি না বন্ধু কি হয়েছে , আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল দেখি পাশে তুমি নেই এদিক সেদিক খুঁজে ও তোমাকে পাচ্ছিলাম না , আচানক শোরগোল শুরু হলো , ঘটনাস্থলে গিয়ে আমি জানতে পারলাম কপোতাক্ষ নদীর তীরে একজন লোক পড়ে আছে , সেখানে যেয়ে তোর দেখা পেলাম, তুই তখন অচেতন অবস্থায় পড়ে আছিস , তারপর তো সবাই তুই জানিস! ফেরার পথে আমরা যখন দু’বন্ধু ঝোপের ঠিক কাছাকাছি পৌঁছলাম তখন ই হঠাৎ করে তীব্র একটা ঘ্রাণে মস্তিষ্কের অনু-পরমানুতে মোহনীয় এক আকর্ষণ অনুভব করলাম। অবসন্ন হয়ে পরলো আমার সমস্ত শরীর।
আমার বন্ধুর হেঁচকা টানে আমার বুকের মধ্যে কম্পন শুরু হলো।
কী হচ্ছে আমার সাথে আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।
এর মাঝে ট্রেনের হুইসেল শুনতে পেলাম। কোনমতে টাল-মেটাল ভাবে হেঁটে ট্রেনে নিজেদের কম্পার্টমেন্টে এসে বসলাম। আস্তে আস্তে ট্রেন তার গন্তব্যে অভিমুখে যাত্রা শুরু করলো। , যশোরের সেই ছায়াঘেরা প্লাটফর্মটি দৃষ্টিসীমা থেকে হারিয়ে গেলো । আমার স্মৃতিতে অম্লান হয়ে বসে রইলো সেই মায়াবী চোখ আর সুরভিত সেই মিষ্টি ঘ্রাণ..
হুইসল দিতে দিতে ট্রেনটা কখন যে এসে বেরিয়ে গেল
বুঝতে পারলাম না, নিঝুম নিস্তব্ধ শুনশান চারিদিক;
তার উপরে পৌষের কম্পন, কুয়াশা মাখা ভেজা আকাশ চারিদিকে জমাট বাঁধা অন্ধকার ভুতের মতো দাঁড়িয়ে আছে বৃক্ষরাজি; ট্রেনের কামরায় একাকী আমি নিশ্চল এক প্রাণী।













