বঙ্গ আর বাঙ্গালী ,শেকড়ের খোঁজে , বাংলার সবচেয়ে পুরানো জনপদ পুণ্ড্র, গৌড় আর বরেন্দ্র
“পুণ্ড্র”, “বরেন্দ্র ” এবং গৌড় ( ১০ )
বঙ্গের সবচেয়ে পুরানো জনপদ ।

কবে, কেমন করে এই জনপদ তিনটি গড়ে উঠে এবং বঙ্গের সভ্যতার ভিত্তি স্থাপন করে তারই বিস্তারিত ইতিহাস।
পুণ্ড্র এবং গৌড় ,বঙ্গের সবচেয়ে পুরানো জনপদ। তার মধ্যে পুণ্ড্র আরও বেশি পুরানো ।
পুণ্ড্র জনপদই বঙ্গের প্রথম জনপদ যার মধ্যে দিয়ে একটি সভ্যতার সৃষ্টি ।
পুণ্ড্রে বসতি স্থাপন হতে থাকে ৩৫০০ বছর আগে ।
নৃবিজ্ঞানী গন মনে করে প্রায় দশ হাজার বছর আগে দক্ষিণ এশিয়ার কোন এক দ্বীপ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় মূল ভূখণ্ড থেকে ভু- আলোড়ন জনিত প্রাকৃতিক কারনে ।
তারপরে ডোঙ্গা ব্যাবহার করে তারা মূল ভূখণ্ডে আসে। সেখান থেকে ভিয়েতনাম ,কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড মায়ানমার , নেপাল এবং বর্তমান বাংলাদেশ হয়ে ভারতে ছড়িয়ে পড়ে । এই ডোঙ্গা শব্দটি অস্ত্রীক এশিয়াটিক ভাষা গোষ্ঠীর।
এই বঙ্গে প্রবেশ করে প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে। এই শ্রেণীর মানুষ এখনো সেইসব স্থানে বাস করছে।
বরেন্দ্র অঞ্চল অন্য সব স্থান থেকে উঁচু ছিল । তাই এখানেই তাদের বাস ছিল।
পুণ্ড্র নগর এই অঞ্চলের সবচেয়ে পুরানো নগর। যা বগুড়ার মহাস্থান গড় নামে এখন পরিচিত ।
পুণ্ড্র নগরের উত্থান আলোচনা করার আগে বরেন্দ্র অঞ্চলের সব কিছু নিয়ে কিছু বিবরণঃ
পুণ্ড্র এবং গৌড়ের কথা মহাভারত বা তাদের ধর্ম গ্রন্থ “বেদ” গ্রন্থে থাকলেও বরেন্দ্রর কথা পাওয়া যায় পাল যুগের মাঝামাঝিতে ।
বরেন্দ্র অঞ্চলঃ
দারজিলিং,জলপাইগুড়ী, মালদহ, দিনাজপুর, রংপুর , বগুড়া, পাবনা, রাজশাহী, চাঁপাই নবাবগঞ্জ বরেন্দ্র অঞ্চলের মধ্যে পড়ে ।
যেসব জায়গায় বরেন্দ্র ভূমীর উল্লেখ আছেঃ
সন্ধ্যাকর নন্দীর “রামচরিত” কাব্য গ্রন্থে বরেন্দ্র নিয়ে উল্লেখ আছে নিচের মতো করে।
“বসুধা শিরো বরেন্দ্রি মণ্ডল ,চূড়ামণি”
ডঃ নীহার রঞ্জন রায় ৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে একটি দক্ষিণী লিপিতে পান “বরেন্দ্র দ্যুতিকরন এবং গৌড় চূড়ামণি ” ।
বরেন্দ্র তখন পুণ্ড্র জনপদের অন্তর্ভুক্ত ছিল।
লক্ষণ সেনের রাজত্ব এবং বরেন্দ্র ভূমির উল্লেখঃ
তাঁর রাজত্বের সীমানায় ছিল উত্তর বঙ্গ, গঙ্গার পশ্চিম জেলা বীরভূম, গঙ্গার পুর্ব দিকে বরেন্দ্র ভূমি, দিনাজপুর জেলার দেবকোট, যেখানে বান গড় বা কটিবর্ষ নামে প্রাচীন নগর ছিল ,সমগ্র রাঢ় অঞ্চল, বগুরা,দিনাজপুর রাজশাহী। এই সব অঞ্চল ছিল বরেন্দ্রের প্রতিনিধী ।
মীনহাজের -ই – সিরাজ এর বিখ্যাত গ্রন্থ “মীন হাজ ই আকবরী” তে যে বর্ণনা পাওয়া যায় এবং সেন রাজার তাম্র লিপি থেকে বোঝা যায় বরেন্দ্র খুব সুপরিচিত ছিল ।
বরেন্দ্র ভূমি সেই প্রাগৈতিহাসিক সময় থেকে অনেকটা উঁচু ছিল । লাল কাঁকর ভূমি এবং স্থান টি ছিল টেরেস বা ধাপে ধাপে উঁচু ক্ষেত ।
ঝোপ ঝাড় আর কাঁটা গুল্ম ভরা স্থান টি আমাদের পুর্ব পুরুষ পরিষ্কার করে চাষের উপযোগী করে তুলে।
তখন বাম দিক দিয়ে প্রবাহিত “করতোয়া” ছিল প্রমত্তা ।আর প্রমত্তা এই নদীর ধারে পুণ্ড্র নগর সভ্যতার ভিত্তি স্থাপন হয়।
বঙ্গনানান আদিম গোষ্ঠী এখানে আসে যুগে যুগে বহু শতাব্দী ধরে। কিন্তু কখন তা সঠিক ভাবে কেউ বলতে পারবে না। বা জানা সম্ভব হবে না।
তবে ৩৫০০ বছর আগে এখানে যে মানুষের বসতির উল্লেখ পাওয়া যায়।
এখানে আসা মানুষ আগে হান্টার গ্যাদারার হলেও পরে তাড়া থিতু হয় এবং কৃষি কে পেশা হিসেবে নায় । কৃষি কাজ করা এবং তা থেকে একটি গ্রামীণ জীবনের সমাজ গড়ে উঠে।
নানান জাতের নানান গোত্রের মানুষ চারদিক থেকে এসে মিলে মিশে এবং পাশাপাশি বসবাস করতে করতে একটি মিশ্র জাতিতে পরিণত হয়।
সুদূর অতীতের বরেন্দ্র ভূমির পুর্নাঙ্গ পরিচয় আর জানা সম্ভব হবে না।
তবে সেই অচেনা আধাচেনা মানবগোষ্ঠীর সংস্কৃতি,খাদ্যাভাস, ভাষা, মুখাকৃতি, DNA এবং নানান গ্রন্থ, শিলালিপি, স্মৃতি শ্রুতি শাস্ত্র মিলিয়ে হারিয়ে যাওয়া বরেন্দ্রের একটা মোটামুটি চিত্র স্থির করেছে নৃবিজ্ঞানী রা । তবে অনেক কিছু আজও অজানা থেকে যাবে।
পুণ্ড্র নগর এবং কৃষি ভিত্তিক সমাজঃ
৩৫০০ বছর আগে পুণ্ড্র নগরের আসে পাশে কৃষি ভিত্তিক সমাজ গড়ে উঠে । ধন ধান্যে ফসলে ভরা এই অঞ্চল এত ব্যাপক ছিল যে এখানে একটি স্বচ্ছল কৃষিজীবী সমাজ গড়ে উঠে। ক্রমশ তারা পুণ্ড্র নগরের কাছাকাছি বসতি স্থাপন করে। এরা সবায় ছিল অনার্য ।
বিখ্যাত ইতিহাসবিদ এবং নৃবিজ্ঞানী রাখাল দাস বন্ধ পাদ্ধায় মনে করেন প্রথমে অনার্য রা এখানে চাষবাস আরম্ভ করে এবং বসবাস স্থাপন করে। কারন রিসেন্টলি এখানে সর্বশেষ যে খনন কাজ চালানো হয় যা কিনা দুর্গের বাইরের ।
সেখান থেকে সাধারণ মানুষের বসতির মাটির বাড়ি ঘর ,মাটির রান্না ঘর এর মেঝে , পাথরের যাঁতা , কালো মসৃণ মাটির পাত্র,রুলেটেড পাত্র, পাত কুয়া, খুটির গর্ত এবং মাটির চুলার চিহ্ন পাওয়া গেছে ।
এ থেকে প্রমাণ মেলে এই দুর্গের বাইরে দুর্গ বানানোর অনেক আগে থেকে মানুষ এসে জড়ো হচ্ছিল । যা কিনা দুর্গের ভিতরে যে মৌর্য এবং গুপ্ত আমলের মন্দির এবং মূর্তির নমুনা পাওয়া গেছে তার চেয়েও পুরানো ।
অনার্য মানুষের বসবাসের অনেক পরে দ্রাবিড় জাতি এখানে আসে হয়তো সিন্ধু সভ্যতা শেষ হয়ে গেলে সেখান থেকে তারা এখানে আসে এবং এই সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে যায় । বলেন রাখাল দাস বন্ধপাদ্ধায় ।
৩০০০ হাজার বছর আগে কৃষক ছাড়াও পুরোহিত, বাড়ি ঘর বানানোর নির্মাণ কর্মি, ব্যাবসায়ী, যোদ্ধা, শাসক,তাঁতি , কারুজীবি এবং পটারী বানানোর লোকজনের যেমন কর্ম আরম্ভ হয় তেমন তাদের থাকা এবং নিরাপত্তার জন্য দুর্গের দরকার হতে থাকে।
প্রাচীন পৃথিবীর সব সভ্যতা আরম্ভ হয় নদীর তীরে । এই করতোয়া নদী ছিল প্রমত্তা । তখন এই নদীর তীরে ব্যাবসা বাণিজ্যের বন্দর গড়ে উঠতে সাহায্য করে। চারদিকে প্রচুর উর্বরা জমি ছিল ।সেই জমি থেকে প্রচুর ফসল হতো। উদ্বৃত্ত ফসল বিক্রি, কার্পাস তুলার বস্ত্র, রেশম বস্ত্র ,ফল আর সবজি এক স্থান থেকে আর এক স্থানে নিয়ে যেতে ব্যাবহার হোতো এই বন্দর।
এই বন্দর কে কেন্দ্র করেি পুণ্ড্র নগরের সৃষ্টি । নগর সভ্যতা বিকাশের পূর্ব স্তর হল উদ্বৃত্ত উৎপাদন। (Strayer-1979-p 5,6 , Wallbank and Taylor p.26-27) 1949)
বরেন্দ্র ভূমীতে করতোয়া নদীর পুণ্ড্র নগরের সভ্যতা এর ব্যাতিক্রম নয়।
পাহাড়পুরের “সোমপুর বৌদ্ধ বিহার”:
পুণ্ড্র নগর বিকাসের প্রায় হাজার বছর পরে বরেন্দ্র অঞ্চলের দক্ষিণের মধ্যস্থলে আর একটি প্রাচীন স্থাপনা এই “সোমপুর বৌদ্ধ বিহার” ।
বৌদ্ধ ধর্ম চর্চা, জ্ঞান অনুশীলন এবং শিক্ষা দীক্ষার কেন্দ্রস্থল ছিল “সোমপুর বিহার” ।
পুণ্ড্র নগর আর বৌদ্ধ বিহার এই দুই প্রাচীন সভ্যতার কেন্দ্র দেশ বিদেশের মানুষকে আকৃষ্ট করে এবং ের আসে পাশে বসতি স্থাপন হতে থাকে।
প্রলুব্ধ হয় বহিরাগত নুতুন নুতুন মানব গোষ্ঠীর এবং বিচিত্র রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহের সৃষ্টি,যুদ্ধ বিগ্রহ আর তা দখল করে নানান সময়ের নানান রাজা রাজড়া ।
যে যখন দখল করে সে তাদের নিজস্ব ধর্মের মূর্তি দিয়ে মন্দির বা উপসনালায় তৈরি করে। এর মধ্যে আছে মৌর্য যুগ,গুপ্ত, পাল,সেন,মুসলিম সব ধর্মের চিহ্ন ।
শিকারী শ্রেণী থেকে কৃষি, কৃষি থেকে নগর সভ্যতার সূচনা এবং নানান রকমের জাতিগোষ্ঠীর আগমন ঘটা, এই ছিল পুরো বরেন্দ্র অঞ্চলের ইতিহাসের পরিচয়।
লিখেছেনঃ হুসনুন নাহার নার্গিস
চলবে













