মা এবং আমি।। মাহমুদা রিনি
আমি যখন জন্মেছিলাম মা তখন সুন্দর, সুশ্রী এক যুবতী। সকল কাজে পারদর্শী, সুচারু সংসারী।
সন্তানলাভে পরিতৃপ্ত সদ্যমাতৃত্বের সুখানুভূতিতে ভরপুর এবং আগামীদিনের স্বপ্নে বিভোর!
আমি একদলা মাংসপিণ্ড, শুধু হাত-পা নাড়তে পারি আমার মা তাতেই আহ্লাদিত।
কাপড়ের ভাঁজে আমাকে জড়িয়ে রাখে বুকের ভিতর নিবিড় মমতায়।
আমি একটু একটু করে বড়ো হই আর মা একটু একটু করে ভারি হয়।
আমাকে মা পৌঁছাতে চায় তার কল্পনার রঙে রঙ্গিন পাহাড়ের চুড়ায়- যেখানে সে হয়ত পৌঁছতে চেয়েছিল একদিন! তার অধরা স্বপ্ন আমাকে ঘিরে বেড়ে উঠতে থাকে আর আমি একটু একটু করে বড়ো হতে থাকি।
একদিন বিদ্যা বুদ্ধিতে মাকে ছাড়িয়ে যাই। না, মায়ের স্বপ্নের মতো করে নয়, নতুন স্বপ্নের বুননে তৈরি হয় আমার আগামী, আমি ছুটতে থাকি আমার লক্ষ্যে। আমার শরীরে অঙ্কুরিত যৌবন। আমার সামনে ভালো- মন্দ, ন্যায়- অন্যায়, প্রেম- বিরহ, কুসুমাস্তীর্ণ থেকে কণ্টকাকীর্ণ সুদূর পথের এক যুদ্ধক্ষেত্র। মা যেন ক্রমশ ভাটার টানে পিছিয়ে পড়ে। আমার সাথে পা মিলিয়ে চলতে পারে না। অনিমেষ চেয়ে থাকে আমার চলার পথের দিকে। আমি বুঝতে পারি তার উৎকণ্ঠা, আবেগ।
তার চোখে সংশয়, অনাহুত কোনো অমঙ্গলের ভয় আর বুকভরা ভালোবাসা।
মা যেন ধীরে ধীরে পুরনো হতে থাকে। তার বুদ্ধি, বিচক্ষণতা আর আমাদের কাজে লাগে না। মায়ের নিজস্ব চাহিদা বা প্রয়োজনও দিনে দিনে ফুরাতে থাকে। তার শাড়িতে তখন আর ইস্ত্রি লাগে না। ব্লাউজের মাপ ঢিলেঢালা গোছের কিছু হলেই হয়। পায়ের স্যান্ডেলে ধুলো জমতে থাকে কারণ মা আর হাঁটতে পারে না। তার সবচেয়ে বড়ো প্রিয় জিনিস হয়ে ওঠে ঔষধের বাক্স। ওটার দিকে এখন সে তাকিয়ে থাকে হয়ত শরীরের একটু আরামের জন্য।
এখন সে শিশু যেমনটা আমি ছিলাম। মা আমাকে খাইয়ে দিত, এখন আমি মাকে খাইয়ে দিই। মা আমাকে গোসল করাতো, মাথা মোছাত, পাউডার মাখাত, জামা-কাপড় পরিয়ে দিত, আমিও তাই-ই করি। শুধু মায়ের মতো স্বপ্ন আমার চোখে খেলা করে না, ভয় হয় হারিয়ে ফেলার!
আমি একদিন অদৃশ্য থেকে মায়ের কোলে এসে তার সবটুকু অধিকার করেছিলাম, মা আমার কোল থেকে সব অধিকার ত্যাগ করে অদৃশ্য হয়ে যায়।













