Bunohash Banner

সেন আমলে ধর্ম দিয়ে মানুষে মানুষে বিভাজন এবং এর বিষবাস্প ,বঙ্গ আর বাঙ্গালি ,শেকড়ের খোঁজে

( ২২ bপর্ব ) বঙ্গ আর বাঙ্গালী ,শেকড়ের খোঁজে 
সেন আমলে ধর্ম দিয়ে মানুষে মানুষে  বিভাজন এবং এর বিষবাষ্প মানুষে মানুষে বিভাজনের  বিসবাস্প
ইতিহাসের পাতা উল্টালে আমরা দেখতে পাই মধ্য যুগে এই বাংলায় বিশাল অংকের মানুষ নিজেদের ধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম গ্রহণ করে।
কিন্তু কেন ?
তরবারীর ভয়ে বা শাসকের জোরে অনেকে ধর্ম ত্যাগ করে বা রাজকীয় সুবিধা লাভের লোভে কিন্তু এর সংখ্যা খুব কম।
কিন্তু মেজরিটি মানুষ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলো তার পেছনের কারন ছিল অন্য,  যা ইতিহাসবিদ দের গবেষণায় উঠে এসেছে ।
সেই রকম একজন ইতিহাসবিদ নাম “Richard Eton” .
তার গবেষণায় দেখা যায় বিহার ও উত্তরপ্রদেশ দিল্লীর শাসকদের ক্ষমতার কেন্দ্র হলেও সেখানে ধর্মান্তর কম। এই কম হওয়ার পেছনের কারন সেখান কার হিন্দু সমাজ ব্যাবস্থা ছিল অত্যন্ত প্রাচীন এবং সুদৃঢ় ।
অন্যদিকে তৎকালীন পুর্ববাংলা ছিল ভৌগলিক ভাবে একটা বদ্বীপ ও প্রান্তিক অঞ্চল।
মন্দির প্রবেশে নিষেধাক্কা
Richard Eton প্রমাণ করেছেন যে , পুর্ব বাংলায়
গন ধর্মান্তর মূলত
ঔরঙজেবের বহু আগে (১৩শ শতকের দিকে) । সুফিদের দ্বারা জঙ্গল কেটে নুতুন কৃষি ভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলার মাধ্যমে ।
বিস্তিৃর্ন  বাংলায় ধর্মান্তরের এই বিশাল স্রোত শুধু মাত্র অস্ত্রের ভয়ে ছিল না।
এর পেছনের কারন শত শত বছরের সামাজিক বঞ্চনা,অপমান এবং চরম ব্রাম্ভ্যন্নবাদের বিরুদ্ধে সাধারণ খেটে  খাওয়া মানুষের এক নীরব বিদ্রোহ ।
আর এই বাংলার বেশির ভাগ মানুষ পেশায় ছিল কৃষক, জেলে এবং  মাঝি। আর ব্রাম্ভন্য বাদে এই শ্রেণীকে ফেলা হয়েছিল  সমাজের নিচু শ্রেণীর মধ্যে ।
যাদের “তথাকথিত ম্যান মেড সেই ধর্মে” সামাজিক কোনো মর্যাদা ছিল না। যা ছিল অসভ্যতার নামান্তর ।
ঠিক একই ভাবে বাংলার হাজার হাজার বৌদ্ধ ধর্মের মানুষ নিজেদের অস্তিত্য বাঁচাতে বাধ্য হয়েছিলেন নিন্ম ধর্মের হিন্দু বা বৈষ্ণব সমাজের সাথে মিশে যেতে।
কি ঘটে ছিল সেই অন্ধকার যুগে?
সেন বংশের জাতপাতের অহংকার আমাদের ধর্মের শেকড় কে দুর্বল করে দিয়েছিল ।
চলে যায় সেই চাপা পড়া সেন আমলের ধর্ম দিয়ে বিভাজন করা বিভীষিকা ময় অমানবিক ইতিহাস জানতে।
বাংলায় চারশত বছর ধরে রাজত্ব করেছিলো পাল বংশ । কিন্তু সে সময় ছিল হিন্দু এবং বৌদ্ধ ধর্মের মানুষের এক সুন্দর শান্তিপূর্ণ সহ অবস্থান। যদিও পাল রাজা রা ছিল বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী । কিন্তু তারা সব  ধর্মের সহবস্থান কে সন্মান করতেন। সমাজে কঠোর আর ঘৃণ্য জাত পাতের ভেদাভেদ ছিল না।
কিন্তু একাদশ শতাব্দীতে যখন সেন রাজ বংশ ক্ষমতায় আসে বিশেষ করে বল্লাল সেন আর লক্ষণ সেন তখন থেকে বাংলায় আরম্ভ হয় অন্ধকার এক অধ্যায় ।
সেন রাজারা কঠিন ভাবে আরম্ভ করে কৌলীন্য বাদ এবং ব্রাম্ভন্য বাদ প্রথা।
সমাজ কে ভাগ করা হয় বর্ণ আর উপ বর্ণ দিয়ে ।
১) ব্রাম্ভন্য ২) বৈদ্য ৩) কায়স্থ  এই তিন শ্রেণীকে রাখা হয় উপরের শ্রেণীর মধ্যে এবং তারাকে উচ্চ স্তরে বসিয়ে বাকি অসংখ্য শ্রমজীবী মানুষকে রাখা হয় নিম্ন স্তরে,  যেমন     শূদ্র, মাহিষ্য কৈবর্ত,পৌণ্ড্র, বাউরী  ইত্যাদি ।
তাছাড়া বৌদ্ধ ধর্মের মানুষকে সমাজের অস্পৃশ্য বা অত্যন্ত নিচু চোখে দেখা শুরু হয়।
এই দুই শ্রেণীর মানুষকে সম্পত্তির অধিকার, শিক্ষার অধিকার কেড়ে  নেওয়া হয়।
অবস্থা এতোটাই করুন ছিল যে উচ্চ বর্ণের মানুষের ছায়া মাড়ালেও তাদের কঠোর শাস্তি পেতে হতো ।
এই মানুষ গুলো নিজেদের সমাজেই পরিণত হয়ে পড়ে বহিরাগত হিসেবে।
এই দমবন্ধ করা সময়ে ত্রোয়দশ এবং চোতুর্দশ শতাব্দীতে বাংলায় বিশেষ করে পূর্ব বাংলায় ইসলাম ধর্মের প্রসার লাভ ঘটে।
এই প্রসার কোনো তুর্কীর বা আফগানির দ্বারা নয়।
এই সুফিরা যখন বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে এলেন তখন দেখলেন এক বিরাট জনগোষ্ঠী পশুর চেয়েও অধম জীবন যাপন করছেন ।
সুফিদের আগমন এবং সাধারণ মানুষের সাথে মিশে যাওয়া
সুফিরা তাদের সাথে মিশে গেলেন। তাদের সঙ্গে মিলে মিশে জঙ্গল কেটে আবাদ করলেন। সাধারণ কৃষকের পাশে দাঁড়ালেন । আর সবচেয়ে বড় বার্তাটি তাদের দিলেন তা হল “ঈশ্বরের চোখে উঁচু নিচু জাত  নাই, সবায় সমান” ।
যে মানুষ গুলো যুগ যুগ ধরে নিজেদের মন্দিরেই ঢুকতে পারিনি ,যাদের অস্পৃশ্য বলে দূর দূর করে তাড়িয়ে দেওয়া হতো ,তারা যখন দেখলেন কেউ তাদের ঘৃণা করছে না তখন তারা যেন নুতুন জীবন ফিরে পেলেন ।
আত্মসন্মান  এবং সামাজিক মর্যাদা ফিরে পাবার প্রবল আকাঙ্ক্ষা বৃহত্তর পুর্ব বাঙ্গলার অবহেলিত বৌদ্ধ আর তাদের ঘোষণায়  “নিম্ন বর্ণের” হিন্দুরা দলে দলে ইসলাম  ধর্ম গ্রহণ করতে শুরু করলেন।
এটা ছিল জাতপাতের অহংকারের বিরুদ্ধে তাদের চরম প্রতিবাদ ।
আর বৌদ্ধ ভিক্কুরা কেউ কেউ ইসলাম ধর্মে কেউ কেউ শ্রী চৈতন্য মহা প্রভুর ভক্তি আন্দোলনের মধ্যে আশ্রয় নিলেন ।
পঞ্চদশ শতাব্দীতে যখন মহাপ্রভু জাতপাত ভূলে প্রেমের ধর্মে সবায় কে ডাকলেন তখন এই অবহেলিত বৌদ্ধরা বৈষ্ণব ধর্মের মধ্যে এক আশ্রয় খুঁজে পেলেন।
তৎকালীন বৌদ্ধ ধর্মের সহজিয়া দর্শন ধীরে ধীরে মিশে যায় বৈষ্ণব সহজিয়া ধারায়।
বখতিয়ার খলজীর সময় আবার কিছু কট্টর মুসলিম দের অত্যাচারে বাধ্য হয়েছিল ধর্ম ত্যাগ করতে কিন্তু পরে যখন তারা নিজ হিন্দু ধর্মে ফিরে যেতে ছেয়েছিল তখন মন্দির আলা ব্রাম্ভন আর তারাকে গ্রহণ করে নাই।
কি ভয়ঙ্কর ছিল সেই সময়টা তাদের জন্য।
একদিকে সমাজের জাত পাতের বিভেদ আর অন্য দিকে বাইরের শাসক দের পাশবিক ধর্মান্ধতা ,এই দুই  এর যাঁতা কলে পিষ্ট হয়েই সেদিন বাংলার বুক থেকে হারিয়ে গিয়েছিল এক বিশাল সনাতন জাতি গোস্টি ।
আমরা যখন নিউজ পেপারে ২১ শতকে দাঁড়িয়ে জাতপাত ,বর্ণবাদ, কাস্ট সিস্টেম, বর্ণ বৈষম্য বা সাম্য না থাকা বিষয় গুলো দেখি তখন ইতিহাস আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দায় “বাইরের কোনো শত্রু নয় বরং আমাদের ভিতরের অহংকার আর বিভেদেই সবচেয়ে বড় কাল। প্রকৃত ধর্ম হল মানুষের সাথে মানুষের আত্মিক মিলন ।যে সৃষ্টি কর্তা আমাদের হৃদয়ে বাস করে তা  মানুষের সাথে ঘৃণা করে কখনো প্রকৃত সৃষ্টিকর্তা কে পাওয়া যায় না। “
তাই সময় এসেছে নিজেদের শেকড় কে নুতুন করে
জানতে ।
সময় এসেছে কে উঁচু আর কে নিচু এই মিথ্যা অহংকার ভুলে আমরা সবায় এক ঐক্যের সূতায় বাধা পড়ি ।
এই যে  ভেদাভেদ তা ধর্ম দিয়েই হক বা নারী পুরুষে হক বা ধনী  দরিদ্রের মধ্যে হক বা পেশা বা কাজ দিয়ে হক তা এখনো আছে।
এই ভেদাভেদ কোনদিন মানুষের  মঙ্গল ডেকে আনে না। একদিন না একদিন সেটা  রিভেঞ্জ নিবেই।
এখনো আমাদের সমাজে কোনো কালচারাল রেভুলেসান হয় নি। শক্ত পোক্ত আইন পাস হয়নি। মানুষের চিন্তা  চেতনা মন মানসিকতা এখনো মধ্য  যুগের মতো।
এখনো দুর্বলের উপরে  সবলের অত্যাচার চলমান। নারী এখানে পুরুষের মতো সমান মর্যাদার নয়।
কোন সময় প্রথা দিয়ে কোন সময় ধর্ম দিয়ে নারীকে দমন করে রাখা হয়।
যা আরম্ভ হয় পরিবারের মধ্যে দিয়েই । সম্পত্তি ভাগা ভাগির মাধ্যমে । পুরুষ নারীর দুইগুণ সম্পত্তি পায় এটা কি জেন্ডার ইকুইলিটি মেনে চলা ?
ধর্মে এর পেছনে যে যুক্তি আছে তা  ভাইরা মানে না মানে শুধু দুইগুণ বেশি নেওয়া। বোন কে  অভাব অনটনে রাখা  দেখে কি সৃষ্টিকর্তা কে খুশি রাখা যায়  ?  এটা ধর্ম হতে পারে না।
তার পরে পেশার কোথায় আসা যাক । এখনো কৃষক বা খামারি কে সন্মানের পেশা বলা হয় না।
দরিদ্র মানুষের সমান অধিকার নায় হসপিটাল , ব্যাঙ্ক বা অফিস আদালতে। কর্মকর্তা সাধারণ মানুষকে সেবা দায় না। রুঢ় আচরণ করে । বুরক্রেসি সব  জায়গায় ।
যে কোন সভ্য বা উন্নত দেশে সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে সব  মানুষের সমান অধিকার আছে। নাই শুধু পাক ভারত উপমহাদেশে ।
ইকুয়াল রাইটস ইকুয়াল অপরচুনিটি কোথাও নাই । বা আইন করে তা মানা হয় না ।
হুসনুন নাহার নার্গিস