Bunohash Banner

কামনা ,বাসনা, আর “দেবদাসী” প্রথাঃ প্রাচীন বাংলা

বাসনা কামনা আর “দেবদাসী প্রথা”
যদিও প্রাচীন কালে বঙ্গে  ছিল গ্রাম ভিত্তিক সমাজ ব্যাবস্থা । ক্রমাগত ভাবে   কালের প্রবাহে ‘বাড়তি ফসল ভিত্তিক’   ব্যাবসা গোড়ে উঠতে থাকে  ।
বিভিন্ন নদী বন্দর দিয়ে  তা ক্রমাগত ভাবে নানা স্থানে যাওয়া আসা আরম্ভ হয় । গড়ে উঠে  “বন্দর কেন্দ্রিক” শহর । সেই শহরে বৃদ্ধি পেতে থাকে নানান পেশার মানুষের আনাগোনা আর লোক  সমাগম ।
জীবন ধারা কিছুটা ভিন্ন হতে থাকে । মানুষের সমাগমে চারদিক মুখরিত ছিল ।
এই সব স্থানে মানুষের মনো বাসনা চরিতার্থ করতে এক শ্রেণীর মানুষ কাজ করতো ।
এই সময় দেবদাসীর উত্থান হয়।
“দেবতার মন্দিরে অঙ্গন তলে, দেবদাসী গো আমি পূজারিণী”
দেবদাসীরা  মন্দিরে মন্দিরে পূজা অর্চনা করতেন  এবং তারা ছিল নৃত্য গীতে  পটীয়সী । মন্দিরে তারা নৃত্যের মাধ্যমে পূজা করতেন।
কিন্তু এরা সমাজের বিত্তবান এবং প্রভাবশালী মানুষদের কামনা বাসনা পুরনের সঙ্গিনীও হতেন ।
“রজত রঙ্গিণী” এবং রাম চরিত কাব্যে এদেরকে “দেব-বারবনিতা” আর “পবন দূতে” “বার- রামা”  বলা হয়েছে।
প্রতিভা বসুর  লেখা ঐতিহাসিক উপন্যাস “কলহনের কমলা কাহিনী” তে আমরা দেখতে পাই “প্রাচীন বাংলার দেবদাসী প্রথার” একটি করুন অধ্যায়  ।
ইতিহাসবিদ “কলহন” তার লেখা “রজত রঙ্গনী” লেখায় দেখিয়েছেন “দেবদাসীদের ইতিহাস” ।
দেখে আসি  সমাজের “দেবদাসীদের জীবন ইতিহাস” । কারন তারাও ইতিহাসের অংশ ।
কমলা কে ছিল? 
কমলা ছিল নিন্মবর্নের এক মেয়ে। খুব ছোটো বেলায় “মন্দিরে সেবার” জন্য দিয়ে দেওয়া হয়। মন্দিরের নিয়ম অনুযায়ী “দেবদাসী দেবতার বউ”। “তার বিয়ে হবে না। সে সারা জীবন মন্দিরেই থাকবে।”
প্রাচীন বাংলায় দেবদাসী প্রথা কেমন ছিল ?
কি ভাবে শুরু ?
গরীব বাবা – মা পেটের দায়ে বা  ‘পুণ্য হবে’ ভেবে ৫/৭ বছরের মেয়ে কে মন্দিরে দান করে দিত । একে বলা হতো ‘বিয়ে’ – কিন্তু বর  ছিল মুর্তি । আর অনুষ্ঠানের নাম “মন্দিরে সমপর্ণ ।
কাজ কি ছিল?
১) সেবাঃ সকাল সন্ধ্যা দেবতার পূজা ,গান, নাচ করা।
২) সন্মানঃ এক সময় এদের অনেক  সন্মান ছিল ।রাজা জমিদাররা দান করতো । কমলা ভালো নাচ  গান করতো ,অর্থাৎ দেবদাসীরে ভালো নাচ  গান জানত ।
৩) শিক্ষাঃ শাস্ত্র,সঙ্গীত , সাহিত্য  শিখত ।তাই অনেক দেবদাসী জ্ঞানী হতো ।
এই বার  আসি তাদের অন্ধকারের ইতিহাস জানতে ।
অন্ধকার দিকটি কি? 
কলহনের বই থেকে জানা যায়
চলত ধর্মের আড়ালে শোষণঃ
বড়ো হওয়ার পরে পুরোহিত, জমিদার, রাজকর্মচারী “দেবতার প্রসাদ” এর  নামে মেয়েদের ভোগ করতো ।
বিয়ে নিষিদ্ধঃ 
তাদের কোন সামাজিক নিরাপত্তা ছিল না। বুড়ো হলে মন্দির থেকে বের করে দিতো ।
সন্তানঃ দেবদাসীদের সন্তান “জারজ” বলে পরিচিত হতো । তাদেরও ভবিষ্যৎ ছিল না।
বাংলায় যে নামে এরাকে ডাকা হতোঃ 
‘নর্তকি’,বাইজী, রুপজীবী। মন্দির কমে গেলে এরা জমিদার বাড়ীর বৈঠকখানায় চলে যেতো ।
ইতিহাসবিদ কলহন ইতিহাসে এদের নিয়ে লিখে জানালেন “ইতিহাস শুধু রাজা-রাজ্য-যুদ্ধ নয় ,ইতিহাস হলো দেবদাসীদের মতো হাজার হাজার মেয়ের কান্না” ।
প্রতিভা বসু তার বইয়ে দেখিছেন ধর্মের নামে নারীকে দেবতার পায়ে বেঁধে রাখা আসলে নারীর স্বাধীনতা কেড়ে  নেওয়া । তাদের কে ভদ্র ভাবে বাঁচতে  না দেওয়া। জীবনের নিরাপত্যা  না দেওয়া এবং এক  অসহায় পরিস্থিতি তে ফেলা।
দেবদাসী প্রথা শুরু হয়েছিল ‘ভক্তি’ দিয়ে । শেষ হয়েছিল ‘শোষণ’ দিয়ে।
কমলা ছিল সেই হাজার কমলার একজন – যার গান দিয়ে দেবতা পূজা পেত । কিন্তু নিজে কোনো  দিন সংসার, স্বামী আর সন্তানের অধিকার পেত না।
আর বুড়ো বয়সে ‘বুড়ো ঘোড়ার’  মতো ‘মূল্যহীন সন্মান হিন’  ভাবে জীবনের শেষ দিন গুলো কাটাতে হতো আমৃত্যু ।
এই ছিল প্রাচীন বাংলার দেবদাসীর ইতিহাস।
তা ছাড়া নগরে এবং গ্রামে “দাসী” রাখার প্রথা ছিল শুধু মাত্র কাম চরিতার্থর জন্য। এবং এই দাসীরা অস্থাবর সম্পত্তির মতো ক্রয় বিক্রয় হতো । — নিহাররঞ্জন রায় এর বাঙ্গালীর ইতিহাস ।
পাল আমলে নারী এভাবে ব্যাবহৃত হতো না কিন্তু সেন আমলে দেবদাসী প্রথা রমরমা ছিল ।