” বাঙ্গালী যে প্রশান্ত সাগর সভ্যতা প্রভাবিত তা বাঙ্গালীর ভাত মাছ খাওয়ার অভ্যাসেই প্রমাণিত” বাঙ্গালীর খাবার
22D
“বাঙ্গালী যে “প্রশান্ত সাগর সভ্যতা প্রভাবিত” তা বাঙ্গালীর ভাত খাওয়ার অভ্যাসেই প্রমাণিত”
নীহার রঞ্জন রাই

“বঙ্গ আর বাঙ্গালী” শেকড়ের খোঁজে, বাঙ্গালীর খাবার
“ভাতে মাছে বাঙ্গালী”
“ওগগরা ভত্তা গাইক ঘিত্তা
ওগগরা ভত্তার মঅ পত্তা গাইক ঘিত্তা দুগ্ধ সজুক্তা
মোইলি মচ্ছা নলিতা শাক (পাট শাক) দিব্বুই কান্তা খা”
অর্থাৎ “গরম ভাত, তাতে ঘি, নলিতা শাক আর মৌরালা মাছের ঝোল যে স্ত্রী প্রতিদিন স্বামী কে রেঁধে খাওয়াবে সে স্বামী ভাগ্যবান” ।
ভাত ভক্ষণের অভ্যাস ও সংস্কার আদি অস্ট্রেলীয় জনগোষ্ঠীর সভ্যতা ও সংস্কৃতির দান।
বাঙ্গালী যে আদি অস্ট্রেলীয় ভাষা গোষ্ঠীর লোক , বাঙ্গালী যে ‘প্রশান্ত সাগর সভ্যতা প্রভাবিত’ তা বাঙ্গালীর ভাত খাওয়ার অভ্যাসে প্রমাণিত এবং বোঝা যায় আমরা কোন সভ্যতা আর কোন সংস্কৃতর অন্তর্ভুক্ত ।

‘প্রধান খাবার মাছ ভাত’ পেছনের কারনঃ
মাটি আর আবহাওয়া অনুযায়ী যে ফসল উৎপাদন হয় সেটাই সেই অঞ্চলের প্রধান খাবার হয়।
মাছ ভাতের সেই হাজার বছরের গল্প হল বাংলা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ডেলটা অঞ্চল। হিমালয় থেকে নেমে আসা সব চেয়ে বড় বড় নদী পদ্মা ,যমুনা আর মেঘনা আর তার শত শত শাখা প্রশাখা জালের মতো ছড়িয়ে আছে বাংলার বুক জুড়ে । আছে খাল বিল হাওড় বাওড় ।
তাই বঙ্গে যেমন নদী প্রচুর ঠিক তেমনই ধান চাষের জন্য পৃথিবীর অন্যতম উপযুক্ত স্থান । বর্ষার বৃষ্টি,নদী বাহিত পলি, উর্বর মাটি সব মিলিয়ে বাংলা হয়ে উঠে ধানের দেশ।
ধান থেকে আসে ভাত
নদী থেকে আসে মাছ
তাই সবচেয়ে বেশি স্বাভাবিক বাঙ্গালীর খাবার হয়ে উঠে “ভাত আর মাছ” ।
মাছ ভাত খাবারের ঐতিহাসিক প্রমাণঃ
অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর চর্যাপদের সাহিত্যে বাংলার মানুষের খাদ্যাভাসে মাছের উল্লেখ আছে।
মধ্য যুগে মঙ্গল কাব্যেও মাছের কথা পাওয়া যায়। সেই সময় বাংলার জনপ্রীয় মাছ ছিল রুই, কাতলা, চিতল, কৈ, মাগুর, মলা , সোল আর ইলিশ ।
মাছ প্রীতির পরিচয় পাওয়া যায় পাহাড়পুর আর ময়নামতির পোড়া মাটির ফলকে । কয়েকটি ফলকে দেখা যায় মাছ কাটা, ঝুড়ি ভোরে মাছ হাটে নিয়ে যাওয়ার দুটো বাস্তব চিত্র ।
অর্থাৎ ১০০০ বছর আগেও বাঙ্গালীর খাবারের কেন্দ্র ছিল মাছ ।
আজ আমরা যে মাছের ঝোল খাই তারও একটা ইতিহাস আছে ।
প্রাচীন বাংলায় খুব সাধারন ভাবে হলুদ,লবন,কাঁচা মরিচ আর সর্ষের তেল দিয়ে মাছ রান্না করা হতো ।
পরে যোগ হয় জিরা, ধনে বাটা,পিয়াজ আর তার সাথে কিছু সবজি মিশিয়ে পাতলা ঝোল । যা আজও বাঙ্গালীর জনপ্রিয় রান্না করার নিয়ম।
বর্ষা কালে ইলিশ এলে পুরো বাংলা উৎসবে মেতে উঠে। প্রতিটি রান্না ঘর মৌ মৌ করে রান্না ইলিশের সুগন্ধে । ‘সর্ষা ইলিশ’ মানেই জিহবায় জল আসা জনপ্রিয় রান্না ।
এবার আসা যাক শাক সবজির কথা। বাংলায় জন্মায় প্রচুর তরিতরকারি । যেমন চাল কুমড়া ,লাউ,নানা রকমের শাক, ঝিঙে, কাঁকরোল ,মিষ্টি কুমড়ো,কচু ,মান কচু, আর পটল ।
ভাতের সাথে পঞ্চ ব্যাঞ্জন যেমন লাবড়া ,ঘন্ট,ভর্তা , ভাজি আর শাক বাঙ্গালীর অবশ্যই সংযুক্ত আর একটা জনপ্রিয় খাবার ।
দরিদ্র মানুষের ভাত আর শাক, কচু ঘেচু দিয়ে পেট ভরানই ছিল নিত্য দিনের খাবার।
ধনী মানুষের পাতে থাকতো বড় মাছ ,ছোটো মাছ ঘি, খির, দই ইত্যাদি ।
আম,কাঁঠাল, তাল , লেচু,কলা আর নারিকেল বাংলার প্রধান ফল যা আগেও ছিল এখনও আছে।
বাংলার মাটি বাঙ্গালীকে অভুক্ত রাখতো না ।
মাংস বাঙ্গালীর আর একটা খাবার ,তবে নিত্য দিনের নয়। হরিন আর ছাগ মাংস ছিল প্রিয় মাংস।
পেছনের কারন শবর,নিষাদ আর পুলিন্দ মানুষের পেশা ছিল শিকার ।
চর্যাগীতের বর্ননায় দেখা যায়
” তেন ন ছু পই হরিনা পিবহ ন পণী
হরিণা হরিণীর নিলয় ন জানী
হরিণী বোলও সুন হরিণা তো
এ বন ছাড়ি হোহু ভান্তো
তরংগতে হরিনার খুর ন দাসই
ভুসুকু ভনই মৃঢ় হি অহি ন পই সই “
অর্থাৎ হরিণ ঘাস ছয় না ,পানি খায় না, হরিণ যানে না হরিণির ঠিকানা । হরিণি এসে বলে শোন হরিণ এই বন ছেড়ে চলে যাও। তীর গতিতে ধাবমান হরিণের খুর দেখা যায় না। তখন ভুসুকু বলে হৃদয় হীনের হৃদয়ে এ কথা প্রবেশ করে না। কারন সে আছে তার নিজ মতলবে।
এই শ্লোক প্রমাণ করে বাঙ্গালী প্রাচীন লাকে হরিণ শিকার করতো মাংস খাওয়ার জন্য।
বাঙ্গালীর বিয়ের খাবার আয়োজন কি হতোঃ
প্রাচীন বাংলায় বিয়ে বাড়ির খাবারে থাকতো ,ব্যাঞ্জন, ডাল , মাংস এবং মাছ।
দই চিড়া বা খৈ , মিষ্টান্ন ছিল প্রধান খাবারের পর ।
সব শেষে পরিবেশন করা হতো পান সুপরি ।
যা কিনা দক্ষিণ পুর্ব এশিয়া আর দক্ষিণ এশিয়ার
নিয়ম । যাকে বলা হয় প্রশান্ত সাগরীয় সংস্কৃতির বাহক ।
এই ছিল প্রাচীন কালের বাঙ্গালীর খাদ্য ।যা আজও চলমান। কারন ভাতে মাছে বাঙ্গালী । যা হাজার বছর ধরে চলে আসছে।












