সেন রাজা দের বাঙ্গালি অন্তর থেকে গ্রহণ করে নাই, তারা ছিল সেই মানুষে মানুষে জঘন্য বৈষম্য সৃষ্টি কারি বংশ, বঙ্গ আর বাঙ্গালি, শেকড়ের খোঁজে
২২ a বঙ্গ আর বাঙ্গালী ,শেকড়ের খোঁজে
বাংলায় সেন বংশ
কারা এই সেন বংশ ? কোথা থেকে আগমন ?
সেন বংশ বঙ্গের নয়।
সেন রাজা দের বসত বাটিঅঙ্গ দেশের কর্ণাটক থেকে দক্ষিণ পথে বীর সেনের পুর্ব পুরুষ বঙ্গে আসে। দেশের মধ্যে অন্তবিদ্রোহে উত্যক্ত হয়ে কর্ণাট ত্যাগ করেন সামন্ত সেন। তিনি কর্ণাটকের রাজা ছিলেন।
তাদের বংশ পরিচয় হলঃ
চন্দ্রকেতু সেন, বিরসেন,
সামন্ত সেন (দেশ ত্যাগ বা রাজ্য ভ্রষ্ট ),
হেমন্ত সেন ১০৪৫-১০৭৯ দক্ষিণ বঙ্গ হয়ে পুর্ব বঙ্গ অধিকার )
তাঁর পুত্রঃ বা বংশ ধর
বিজয় সেন (১০৭৯_১১১৯)
বল্লাল সেন ১১১৯-১১৬৯)
লক্ষণ সেন (পুর্ব বাংলার দায়িত্ব পান)
লক্ষণ সেনসে সময় বাংলার ভাগ ছিল গৌড়, রাঢ়, বঙ্গ, পুণ্ড্র,
উপবঙ্গ, পরে উপবঙ্গের নাম হয় বাগারি এবং বাগারির নাম হয় “সমতট” ।
কি ভাবে রাজনৈতিক ক্ষমতা পায় সেন বংশ
পাল রাজা দের লেখনী থেকে জানা জায় পাল রা অনেক সময় বিদেশী কর্মচারী কে প্রশাসানিক কাজে নিয়োগ দিতেন। সে সময় সেন রা বাংলায় এসে বসতি স্থাপন করে এবং পাল দের প্রশাসনিক কাজ পায়।
কোন কোন ইতিহাসবিদ মনে করে সামন্ত সেন পাল আমলে মহা সামন্ত ছিলেন এবং পাল রাজাদের দুর্বলতার সুযোগে বাংলার সিংহাসন দখল করেন ।
লক্ষণ সেনের মৃত্যুর পর থেকেই বাংলায় সেন আমল দুর্বল হয়ে পড়ে ।
বরেন্দ্র অঞ্চলে রাজশাহীর গোদাগারী অঞ্চলে “দেওপাড়া” থেকে একটি শ্লোক বা প্রশস্তি উদ্ধার হয় । যেখানে এখনো ধ্বংষাবশেষ পড়ে আছে । সেইখানে নীচের শ্লোক টি উদ্ধার হয় ।
“ত্বং নান্যবীরবিজয়রীতি গিবং ক বিলং
স্ররুত্বান্যথা মনন রুঢ়নি গুঢ়রোষ
গৌড়েন্দ্রমদ্রবদ প্রাকৃত কামরূপ
ভুপং কলিঙ্গ মপি যস্তরসা জিগায় ”
বল্লাল সেনের পুত্র লক্ষণ সেন (১১৬৯-১২০৬) সিংহাসনে বসেন। কিন্তু বখতিয়ার খিলজির আক্রমণে গৌড় ও নবদ্বীপ থেকে নৌকা যোগে পলায়ন করে পুর্ব বঙ্গে। সঙ্গে নেন অনেক ব্রাম্ভন আর পুরো পরিবারকে । এই জন্য বিক্রমপুরে অনেক ব্রাম্ভন এতো বেশি ।
বল্লাল সেনের পুত্র লক্ষণ সেন গৌড়ের শেষ হিন্দু রাজা। লক্ষণ সেনের মৃত্যুর পরে তার পুত্র মাধব সেন রাজা হন। মুসলমানদের হাত থেকে রক্ষা করতে সর্বদা প্রস্তুত থাকতে হতো ।
পুর্ব বঙ্গে তারা অনেক দিন শাসন করে। হিমালয় তির্থ ভ্রমণে গেলে মাধবের ভ্রাতা কেশব সেন রাজা হয়। লক্ষণ সেনের কনিষ্ঠ পুত্র বিশ্বরূপ সেন বর দুই ভাইয়ের চেয়ে সাহসী ছিলেন এবং মুসলমানদের বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু পরাজিত হয়ে পূর্ববঙ্গে পলায়ন করে।
সেন রাজাদের বাঙ্গালী অন্তর থেকে গ্রহণ করে নেয়নি
কেন নেয়নি ?
প্রথমতঃ তারা বাঙ্গালী ছিল না।
দ্বিতীয়তঃ সেন দের শ্রেণী বৈষম্য বা জাত পাত প্রথা যা সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ কে দূরে সরিয়ে দায় । সেন দের এই শ্রেণী বৈষম্য প্রথা বাংলার মেজরিটি মানুষকে সন্মান দায়নি । নিচু চোখে দেখেছে ।
রামপাল পরবর্তী বাংলা রাষ্ট্রীয় ভাবে ভেঙ্গে পড়ে । আর এই ভেঙ্গে পড়ার সুযোগ নিয়ে সেন রাজ বিজয় সেন বাংলায় অধিকার সুপ্রতিস্ট করে।
সে সময়ে পাল রাজাদের মধ্যে হিংষা হিংষী আর অন্ধ রাষ্ট্র বুদ্ধি চলমান ছিল । হয়তো সেন রাজাদের আগমনে বাঙ্গালী কিছুটা স্বস্থি পেলো বটে কিন্তু তাদেরকে মন থেকে মেনে নায়নি ।
পাল রাজারা যতোটা বাঙ্গালীর হৃদয়ের কাছাকাছি ছিল সেন রাজারা তা হতে পারে নাই ।
তার কারন পাল রাজাদের পিতৃ ভূমী ছিল এই বাংলা । আর তারা ভেদাভেদ করেনি ।
মহীপালের গীত
ধান ভানতে ভানতে বাঙ্গালী নারী মাহিপালের গীত যে ভাবে গাইতো সেন আমলে সে ভাবে তাদের গীত বাঙ্গালী গাইতো না ।
‘গোপাল নির্বাচনের” কাহিনী বা ধর্মপালের যশ যে ভাবে দোকানে,হাটে বাটে ঘাটে গীত হতো কিংবা মহীপাল, যোগিপাল, ভোগিপালের গানের স্মৃতি যে ভাবে বাঙ্গালী ধারণ করে সেন রাজাদের সে
সৌভ্যাগ্য হয়নি ।
অর্থাৎ অপামার জনসাধারনের মনে সেন রাজারা স্থান করে নিত্যে পারে নাই।
উচ্চ শ্রেণীর ব্রাম্ভন সেন রাজাদের স্তুতি যে ভাবে করতেন তা শুধু তাদের অনুকূলে থাকার জন্য।
পাল বংশ কে বাঙ্গালী ভালো বেসেছিল এবং তাদের গৌরব কে নিজেদের জাতীয় গৌরব বলে মনে করতেন। সেন রাজাদের নিয়ে বাঙ্গালী গৌরব অনুভব মোটেও করেনি ।
তাই বাংলা সাহিত্যে বা লোক গীতিতে সেন রাজাদের নামে কোন গীত নাই ।
লক্ষণ সেনের পরাজয় (১১৭৮-১২০৬)
যে আত্ম কতৃর্তের ব্যাধি পাল রাজাদের ভিতর থেকে দুর্বল করেছিলো ,সেন রাজাদের ক্ষেত্রে সেই একই ব্যাধি ছিল । এই ব্যাধির রাষ্ট্রীয় রূপ “সামন্ততন্ত্র” ।
গাহড়বাল রাজ্য ছিল সেন আমলে মুসলমানদের প্রতিরোধের প্রাচীর। মুহাম্মাদ খলজী বিনা বাধায় গাহরবাল রাজ্যের শেষ শক্তি কে পরাজত করে বিহার এবং বাংলা জয় করে। সেন রাজা কিছুই করতে পারে নাই।
বখতিয়ার খলজি ঝাড়খণ্ডের জঙ্গলের মধ্য দিয়ে ১৮ জন অনুচর নিয়ে নদীয়া পৌঁছে । সে সময় বাংলার রাজা দের বাড়ি মুঘল দের মতো ইট পাথরের ছিল না। মধ্য যুগে রাজারা বাংলো ঘরে থাকতেন।
নদীয়ে থেকে চলে গিয়েছিল ভবিষ্যৎ বাণী অনুসারে। মধ্যাহ্ন ভোজনে রত লক্ষণ সেন পেছনের দরজা দিয়ে নৌকা যোগে পুর্ব বাংলায় সপরিবারে পলয়ন করে। খলজি বিনা বাধায় বাংলা ও বিহার দখল করে।
সেন বংশের পতনের কারন
১) সমগ্র ভারতীয় এক্যবোধ বা বৃহত্তর রাষ্ট্রীয় আদর্শ গড়ে উঠে নাই।
২) কৃষক শ্রেণীকে অবহেলা
সেন আমলে কৃষক শ্রেণী বা খেটে খাওয়া মানুষ দের অবহেলা বা নিচু চোখে দেখা হয়েছে যা পাল যুগে
হয়নি । অথচ দেশ ছিল কৃষি নির্ভর ।
সেন যুগে সামাজিক দৃষ্টি সংকীর্ন ছিল । সমাজ ছিল উঁচু নীচু শ্রেণীতে পুর্ন ।
৩) রাজ্য পরিধি বিস্তার লাভ হয়নি ।
৪) আমলাতন্ত্র ক্রমবর্ধমান ,যেমন মহামন্ত্রী, মহা পুরোহিত, মহাসন্ধি বিগ্রহি ইত্যাদি । তারা তাদের কত্ত্রি দেখাতো সব স্থানে ।
৫) রাজার সর্বময় ক্ষমতা বৃদ্ধি ,নুতুন উপাধি গ্রহণের আতিশয্য , রাজপরিবারের আভিজাত্য ও জৌলুস
বৃদ্ধি ।
৬) ব্যবসায়ী শিল্পী ছিল বর্ণ বিন্যাসের
নিন্ম স্তরের ।
৭) বৌদ্ধ ধর্মের মানুষ রাজ অনুগ্রহ লাভ করতো না। অথচ ব্রাম্ভন্য পূজা অর্চনার জয়জয়াকর । বৌদ্ধ ধর্ম এ সময়ে বিলীন হয়ে যায় ।
৮) ইতিহাসের ধিকৃত রাজা ।
তুর্কী আক্রমনের বিরুদ্ধে রাজপুত রাজারাও ব্যার্থ হয় তবে তারা প্রতিরোধ করেছিলো । কিন্তু বিনা যুদ্ধে রাজ্য ছেড়ে পলায়ন এটা একটা লজ্জার ব্যাপার এবং প্রথার ব্যার্থতা ।
৯) সেন রাজার “সামাজিক ভেদনীতি” বাংলায় সামাজিক ঐক্য নষ্ট করে জাতিভেদ শুধুমাত্র যে উঁচু শ্রেণীর সুবিধা ভোগ সৃষ্টি করে তাই নয় এই ভেদাভেদ জাতীয় সংহতি ধ্বংস করে। তার ফল লক্ষণ সেন কে ভুক্তে হয়েছে। তার বিপদে সাধারণ মানুষ কেউ এগিয়ে আসে নাই।
ইখতিয়ার উদ্দিন মোঃ বখতিয়ার খলজি১০) জন জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল শাসন ব্যাবস্থা এবং তারি ধারাবাহিকতায় বৈদেশিক আক্রমণের বিরুদ্ধে কোন অভ্যুথান হয় নি । সামন্ত রাজারা বিচ্ছিন্ন ছিল বলে তারা তাকে সহযোগিতা করেনি ।
হুসনুন নাহার নার্গিস












